খুলনায় জনসমুদ্র

খুলনায় জনসমুদ্র

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে সবার দৃষ্টি ছিল খুলনার দিকে। সুন্দরবন ঘেষা এই বিভাগীয় শহর গতকাল শনিবার পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। খুলনার মানুষ আগে কখনোই কোন সমাবেশে এতো মানুষের উপস্থিতি দেখেনি।

দুইদিন ধরে খুলনার সাথে অন্যান্য জেলার সড়ক, নৌ যোগাযোগ বন্ধ, পথে পথে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের চেকপোস্ট, বাধা প্রদান, গাড়ি ফিরিয়ে দেয়া, ট্রলার ডুবিয়ে দেয়া, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, হামলা, গ্রেফতার সবই হয়েছে। বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচল রোধে এমন কোন পদক্ষেপ নেই যা নেয়া হয়নি। তবে শত বাধা, হামলা, গ্রেফতার উপেক্ষা করেই খুলনায় বিএনপির গণসমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে।

নৌকা, ট্রলার, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ট্রেনে, পায়ে হেঁটে যে যেভাবে পেরেছে উপস্থিত হয়েছে খুলনার সমাবেশে। সরকার সমাবেশে বাধা প্রদান করবে ভেবে অনেকেই শুক্রবারের মধ্যেই পৌঁছে যান খুলনা শহরে। আশপাশের জেলা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা নেতাকর্মী-সমর্থকদের কেউ কেউ রাত কাটিয়েছেন হোটেলে, নিজের আত্মীয়-স্বজনদের বাসায়, তবে বেশিরভাগই রাত কাটান সমাবেশস্থলে। রাতে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা সমাবেশ স্থলের রাস্তায় আর ফুটপাতে প্লাস্টিকের বস্তা-পাটি পেতে ঘুমিয়েছেন।

দলের বিভিন্ন নেতার পক্ষ থেকে সকালের নাস্তা ও খাবার পানীয় সরবরাহ করা হয়। সকালেই খুলনা নগরীর সোনালী ব্যাংক চত্বর বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। খুলনা রেলস্টেশন, স্টেশন রোড, কেডি ঘোষ রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, ডাকবাংলো মোড়, ফেরিঘাট মোড় পর্যন্ত ঠেকে জনস্রোত। সোনালী ব্যাংক চত্বর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে শিববাড়ি মোড় পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন।

বাস, লঞ্চ, ট্রেন-সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ করার পরেও খুলনার সমাবেশে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেখেন, হামলা, মামলা, হয়রানি করে এবং পথ আটকে জনগণের গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষাকে দমিয়ে রাখা যায় না। তারই প্রমাণ দিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ৫ নেতাকর্মীর মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ বন্দী নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে গতকাল শনিবার খুলনা শহরের ডাকবাংলা এলাকার সোনালী ব্যাংক চত্বরে বিভাগীয় সমাবেশ করে বিএনপি।

এদিন বেলা ২টায় সমাবেশ শুরুর ঘোষণা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির কারণে বেলা ১টার দিকেই কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হয়। তবে তার আগেই লাখো মানুষের উপস্থিতিতে খুলনার সোনালী ব্যাংক চত্বরকে কেন্দ্র করে রেলস্টেশন, স্টেশন রোড, কেডি ঘোষ রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, ডাকবাংলো মোড়, ফেরিঘাট মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

 যদিও এই গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে দুই দিন আগেই খুলনা জেলার সড়ক ও নৌ চলাচল বন্ধ করে কার্যত; খুলনাকে সারাদেশের সাথে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই খুলনায় বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাসহ সকল ধরণের সড়ক পরিবহন বন্ধ করে দেয় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতি, একইভাবে পরের দিন নৌপথ বন্ধ করে দেয়া নৌ পরিহন শ্রমিকরা। ফলে সমাবেশ আসতে বেগ পেতে হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। এরপরও বিভিন্ন জেলা থেকে তারা ব্যক্তিগত গাড়ি, অটো, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, নৌকা, ট্রলার, ট্রেনে করে যোগ দেন সমাবেশে। তবে তাদের অভিযোগ সমাবেশে আসার সময় বিভিন্ন জেলায় এবং খুলনার প্রবেশপথগুলোতে পথে পথে হামলা, বাধা দেয়া হয়েছে।

অনেক গাড়ি ও ট্রলার ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। হেটে আসা মানুষগুলোকে পড়তে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বসানো চেকপোস্টে। প্রত্যেককেই তল্লাশি করে আসতে দেয়া হয়েছে। যাদেরকে সন্দেহ হয়েছে তাদেরকে করা হয়েছে মারধর। এছাড়া বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতে খুলনা মহানগরের বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে, শহরের হোটেলগুলোতে চালানো হয়েছে তল্লাশি। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যে বাড়িতে উঠেছিলেন সেখান থেকে ৩৫জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গণসমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণসমাবেশে আসনে নেতাকর্মীদের সীমাহীন বাধা দিয়েছে। আমি পুলিশ প্রশাসনের ভাইদের বলতে চাই, আপনাদের ফোন করলে বলেন, না সব ঠিক আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমরা তো বিএনপির সমাবেশে বাধা দিই না; বরং সহযোগিতা করি।’ কী সহযোগিতা করেছেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে সে প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘স্টেশনে নামার পরে আমাদের ছেলেদের গ্রেপ্তার করেছেন। আমাদের চোখের সামনে আমাদের ছেলেমেয়েদের কুপিয়েছে, আপনারা কিছুই বলেননি। বরং খেয়াঘাটে গ্রেপ্তার করেছেন, আহত করেছেন। যাতে সমাবেশে যোগ দিতে না পারে, তার ব্যবস্থা করেছেন। তারপরও তারা পারেনি।’

নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা অসাধ্যকে সাধন করেছেন। তিন দিন ধরে জলে-স্থলে সব পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে। দুই দিন ধরে বাস বন্ধ, লঞ্চ বন্ধ করেছে, নৌকা বন্ধ করেছে, খেয়াঘাট বন্ধ করেছে। কিছুই চলতে দেয়নি। তারপরও কি আপনাদের গণতন্ত্রের যে আকাক্সক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠার যে লড়াই, সে লড়াইয়ে বাধা দিতে পেরেছে? ইতিহাস বলে, কোনো দিন জনগণের ন্যায়সংগত দাবি উপেক্ষা করে শুধু শক্তি দিয়ে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষকে দমিয়ে রাখা যায় না। সেটিই আপনারা আবার প্রমাণ করেছেন।

বিএনপির মহাসচিব জানান, গত দু-তিন দিনে পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাজারো নেতা-কর্মীকে আহত করেছে। রূপনগরে ২০ জন গুলিবিদ্ধ, কেশবপুরে ১৫ জন গুলিবিদ্ধ, মোংলায় ট্রলারে আসা প্রায় ১০০ নেতা-কর্মীকে আহত করে ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ায় ১০০ নেতা-কর্মীকে আহত করেছে। বাগেরহাটের মিছিলে ৭০ নেতা-কর্মীকে আহত করেছে। গ্রেপ্তার করেছে ৫০ জনকে। নগরের ৫ ও ৭ নম্বর ঘাটে আসা ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন কর্মীকে এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। খুলনা রেলস্টেশনে নেতা-কর্মীদের মারধর করা হয়েছে, গত দুই দিনে হোন্ডা মহড়া দিয়েছে হকিস্টিক উঁচিয়ে। রামপাল-কাটাখালীতে হামলা হয়েছে।

বিএনপির এই নেতা বলেন, এই যে এত মানুষ আহত হলো, এত মানুষ গ্রেপ্তার হলো, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হলো। এটা কেন? এ প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকের এই সভা একটা প্রতীক মাত্র। এই প্রতীক হচ্ছে আমাদের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, বাসস্থানের অধিকার। সেই অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য এই সভা।’

এ সময় বিএনপির মহাসচিব উপস্থিত নেতা-কর্মীদের কাছে জানতে চান, ২০১৪ সালে ভোট দিতে পেরেছিলেন? ২০১৮ সলে ভোট দিতে পেরেছিলেন? উপস্থিত জনতা ‘না’ ধ্বনি উচ্চারণ করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আবার ২০২৩ সালে নির্বাচন আসছে। সেই নির্বাচনকে আবারও একই কায়দায় তারা নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেছে। তারা একটা নির্বাচন কমিশন করেছে। সেই কমিশন আপনারা মানেন?’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে বলছি, এ দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সুতরাং আর কোনো কথা নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দিলে কোনো নির্বাচন হবে না। সে জন্য এ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। অনেক ক্ষতি করেছেন। অনেক ক্ষতি করেছেন এই ১৫ বছরে- আমাদের যা কিছু অর্জন, সব কেড়ে নিয়েছেন, অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছেন, মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা লুট করেছেন। ব্যাংকিং, শেয়ারবাজার, বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন। বিদ্যুতের উন্নয়নের নামে প্রতিবছর ২৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছেন। তারপরও দিনে চার থেকে পাঁচবার করে লোডশেডিং হচ্ছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। প্রশ্ন রেখে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘কেন? আপনি তো ঘোষণা দিয়েছেন যে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে। তারা জাতির সামনে এই মিথ্যা কথাই প্রচার করে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, এখন বলছে, দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে।

এর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, যুদ্ধটা পুলিশের বিরুদ্ধে না। পুলিশ বাহিনীকে বুঝতে হবে। পুলিশ জনগণের টাকায় চলে জনগণের সেবা করার জন্যে। পুলিশ বাহিনী প্রধানমন্ত্রীর বাসার চাকর-বাকর না, যে যা বলবে তাই শুনতে হবে। ভয় পাবেন না, কোনো অন্যায় আদেশ পালন করবেন না সরকাররে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয়ক শামসুজ্জামান দুদু বলেন, অচিরেই আমরা ক্ষমতায় যাচ্ছি। আমরা আওয়ামী লীগকে কখনো ক্ষমা করব না। কয়েক দিনের মধ্যে তারা আমাদের পাঁচজনকে হত্যা করেছে। এই প্রতিশোধ নেব। খুলনা থেকে শপথ, শেখ হাসিনার অধীনে আর কোনো নির্বাচন করতে দেব না। আওয়ামী লীগের লোকেরা বলেছিল পদ্মার এপারে কোনো সমাবেশ করতে দেবে না। তারা একটু এসে দেখুক, লজ্জা পাবে। এখানে জনসমুদ্র হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমাদের খুলনায় গণসমাবেশে জনসমুদ্র আর এই বিশাল আয়োজন দেখে বিস্মিত তারেক রহমান। তিনি কিছুক্ষণ আগে দলের মহাসচিবকে এ কথা জানিয়েছেন।আওয়ামী লীগ ভেবেছিল তাদের বাধায় আমাদের কেউ আসবে না। তবে এখানে জমায়েত জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। তাদের দেখিয়ে দিয়েছি, আমাদের দুর্বল ভেব না। রেলস্টেশনে বাধা দিয়েছিল, যশোরের নেতা-কর্মীরা আমাদের শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। অমিত আরও বলেন, ‘এই খুলনায় আজ লাখো কণ্ঠে বাঘের গর্জন শুরু হলো। ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের পতন আমরা ঘটাব। তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনব।

খুলনা মহানগর বিএনপির সদস্য ও খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির প্রধান সহ-সমন্বয়ক রকিবুল ইসলাম বকুল বলেছেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাধারণত বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ ডাকে। কিন্তু এখন স্বৈরাচার সরকার, শেখ হাসিনার সরকার নিজেই হরতাল ডেকে নিজেই নিজেদের বন্দী করেছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করে দিয়েছে এই সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার।
সরকারের উদ্দেশে রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন, তাতে হয়তো জনগণ আপনাদের মাফ করলেও করতে পারে। তা না হলে পালাতে পারবেন না। পালাতে দেওয়া হবে না।

সমাবেশের সভাপতি খুলনা মহানগর বিএনপির আহবায়ক এসএম শফিকুল আলম মনা বলেন, এ সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। খুলনার মানুষ আজ এ সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ জানিয়েছে দিয়েছে মধ্য রাতের ভোটের এ সরকারের ক্ষমতা আকঁড়ে ধরে থাকার কোনো অধিকার নেই।

জেলা বিএনপির আহবায়ক আমির এজাজ খান বলেন, অনেক ক্ষতি করেছেন, ভালো অর্জনগুলো ধ্বংস করে দিয়েছেন। মেগাপ্রকল্পের নামে মেগা লুট করেছেন। শেয়ার বাজার লুট করেছেন। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে লুট করে পাচার করেছেন। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন। অনেক করেছেন আর নয়।এবার পদত্যাগ করুন।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, নির্বাচনকালীন সরকার, জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পুলিশের গুলিতে নেতাকর্মী হত্যা, হামলা ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে গণসমাবেশের অংশ হিসেবে খুলনায় বিএনপি এ বিভাগীয় সমাবেশ। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির আহবায়ক এসএম শফিকুল আলম মনা।

সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন- স্থায়ী কমিটির ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান এড. নিতাই রায় চৌধুরী, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, যুবদলের সুলতান সালাহউদ্দীন টুকু। সমাবেশে যোগ দিতে শুক্রবার রাতেই নেতাকর্মীদের খুলনায় আসতে দেখা যায়। পরে সকাল থেকে দলে দলে সমাবেশে যোগ দেন নেতাকর্মীরা।

বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হয়েছেন তিন শতাধিক, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৩৫ জন, গ্রেফতার করা হয়েছে ৫শ নেতাকর্মীকে।
যশোরের কেশবপুর উপজেলা থেকে শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে খুলনার সোনাডাঙ্গায় পৌঁছান শহিদুল ইসলাম। একটি পিকআপে শহিদুলরা অন্তত ৬০ জন ছিলেন। শহিদুল বলেন, সোনাডাঙ্গা থানার সামনে পৌঁছানোমাত্র এলোপাতাড়ি হামলার শিকার হন সবাই। শহিদুলের হাতে ও পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে। মাথা ফেটে গেছে সঙ্গে থাকা জিয়াউল হোসেনেরও।

শহিদুল ইসলাম বলেন, মারধর করতে করতে হামলাকারীরা তাঁর পকেট থেকে ১০০ টাকা ও মুঠোফোনটি নিয়ে গেছেন। জিয়াউল হোসেন বলেন, তাঁর পকেট থেকে ৭০০ টাকা কেড়ে নিয়েছেন। পাশেই বসে আছেন একই এলাকার বাসিন্দা মাজিদ সরদার। তিনি মার খাননি। তবে তাঁর পকেট থেকে ৫০০ টাকা ও মুঠোফোনটি হামলাকারীরা ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন।

যশোর জেলা ছাত্রদলের সদস্য আক্তারুজ্জামান সুমন বলেন, রাত আড়াইটার দিকে সোনাডাঙ্গা এলাকায় তাঁদের বহনকারী ট্রাকের ওপর হামলা চালান ৩০-৪০ যুবক। সবার হাতে হকিস্টিক, লোহার রড, কাঠ ও বাঁশের লাঠি ছিল। হামলায় সুমনসহ ৮ থেকে ১০ জন আহত হন। বাগেরহাটের রামপাল থানার তালতলিয়া গ্রাম থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী গোলাম আজম বলেন, তাঁরা ছয়টি বড় পিকআপে একসঙ্গে ৪৫০ জন সমাবেশে আসেন। রাস্তায় রূপসা সেতুর টোলে এবং কাটাখালী ও খুলনার জিরো পয়েন্টে বাধা পান। এর মধ্যে কাটাখালীতে লাঠিপেটায় গুরুতর আহত হয়েছেন তিনজন। তাঁদের নগরের রাইনা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে সমাবেশের দিন সকাল থেকে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। নগরের বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। কোনো কোনো এলাকায় মহড়া দিতে দেখা গেছে তাঁদের। এ সময় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মারধর করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বেলা ১২টার দিকে খুলনা রেলস্টেশন এলাকায় পুলিশ ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের সময় রেলস্টেশনে ভাঙচুর করা হয়। বিএনপির সমাবেশে আগত ব্যক্তিদের বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১২টার দিকে রেলস্টেশন চত্বরে ভিড় করেছিলেন বিভিন্ন এলাকা থেকে সমাবেশে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এ সময় পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এটা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে পুলিশ বিএনপির নেতা-কর্মীদের লাঠিপেটা করে। এ সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং স্টেশনের বিভিন্ন জানালা-দরজার কাঁচ ভেঙে ফেলেন। প্রায় আধঘণ্টা পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

বিএনপির কার্যালয়ে আগুন: শহরের বৈকালী মোড়ে আদ-দ্বীন হাসপাতালের সামনে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী এনায়েত আলীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন। বেলা দুইটার দিকে ওই কার্যালয়ের পাশে বিএনপির কার্যালয় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে কে বা কারা আগুন দিয়েছে সেটা জানা যায়নি।

খালেদা জিয়ার আসন খালি: চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের মতো খুলনার সমাবেশের মঞ্চেও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মানে একটি চেয়ার খালি রাখা হয়। এর উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) আমাদের বলেছেন যে তোমরা সঠিক পথে আছ, এভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাও। জনগণের অধিকারকে আদায় করে নিয়ে আসো। সে জন্যই তাঁর সম্মানে এ চেয়ার খালি রাখা হয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ