আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামার আশঙ্কা

আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামার আশঙ্কা

মিয়ানমারে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় রাখাইন রাজ্যে কিছু দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। যার প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে বান্দরবানের ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রতিদিনই আকাশে উড়ছে হেলিকপ্টার।

বাংকার থেকে ছেঁাঁড়া গোলার বিকট শব্দে কাঁপছে এপাড়ে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, বাইশাফাড়ি, রেজু গর্জনবনিয়া, আমতলিসহ পুরো সীমান্ত এলাকা। মাঝে মাঝেই মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া গোলা, মর্টার শেল এসে পড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নো ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রিত সাড়ে চার হাজার রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তিন দফা তলব করে প্রতিবাদ জানানো হলেও থামেনি তাদের আগ্রাসী তৎপরতা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলেরও আশঙ্কা বাড়ছে। 

এদিকে গত রোববার সচিবালয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা কূটনৈতিকভাবে দেখব। আমরা তো যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান করব। আজকের সিচুয়েশন, সেখানে গোলাবারুদ কমে গেছে। বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভারী গোলাগুলির ঘটনা কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। আকাশ সীমানায় মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারের মহড়ার পর গত ২৮ আগস্ট দুটি মর্টার শেল এসে পড়ে বাংলাদেশের অংশে। এরপর কাঁটাতারের ওপাড়ে মিয়ানমারের ভেতর সেনাদের টহল দিতেও দেখা যায়। 

এছাড়াও প্রায়ই গুলীর শব্দ শোনা যাচ্ছে তুমব্রু সীমান্তে। অন্যদিকে মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের অবস্থা ভালো নয় বলে জানাযায় বিভিন্ন সুত্রে। এক পক্ষ বলছে, সেখানে তারা চাপে আছে। অন্য পক্ষ বলছে, ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে সেনাবাহিনী। যারফলে অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কথা ভাবছেন। এই অবস্থায় বাংলাদেশে আবারও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।

বিভিন্ন সূত্রে আরও জানা গেছে, বিদ্রোহী দমনের নামে কৌশলে রোহিঙ্গাদের আরাকান রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে মিয়ানমার। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের বুচিদং এলাকার একাধিক গ্রামে রোহিঙ্গাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্ত সিলগালাসহ যে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।  

সূত্র জানায়, ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকা। ২০১৭ সালের মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেবে না বাংলাদেশ এমন স্পষ্ঠ বার্তা দেওয়া হয়েছে। নেপিদোর বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ঢাকার উদ্বেগের বিষয়টি শক্তভাবে জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় বিদেশি মিশনগুলোকেও জানানো হয়েছে যে একজন রোহিঙ্গাকেও আর নেবে না বাংলাদেশ। বরং যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে নজর ঢাকার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে আগাতে হবে।

প্রতিবেশী ভারত ছাড়া কেবল মিয়ানমারের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের। সেই সীমান্তে থেমে থেমে নানা উত্তেজনা বহু বছর ধরে চলে আসছে। ২০০৭ সালে সেন্টমার্র্টিনে ঢুকে পড়েছিল মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধজাহাজ। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে অস্ত্রসহ বিজিবি সদস্যকে অপহরণ করে তারা। বান্দরবনের থানচিতে মর্টারশেল ও গুলী পড়ে ২০১২, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে। ২০১৪ সালে বান্দরবনের নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবি সদস্যকে হত্যা করে লাশ নিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখায় মিয়ানমার। ২০১৯ ও ২০২০ সালে সেন্টমার্টিনকে নিজেদের অংশ দেখায় দেশটি। আর গত এক মাসে কয়েকবার মিয়ানমারের ছোডা মর্টারশেল ও গোলা বারুদ পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।

এদিকে গত শুক্রবার বিকালে মিয়ানমার থেকে ছোড়া আরও একটি গোলা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়েছে। এটি তৃতীয় দফায় আসা গোলা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডেও তুমব্রু ঘোনারপাড়া নামক এলাকায় এটি পড়ে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এর আগে গত ২৮ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত দুটি মর্টারশেলের গোলা একই ইউনিয়নের তুমব্রু উত্তরপাড়া জামে মসজিদ এলাকায় এসে পড়ে। সেগুলো বিস্ফোরিত না হওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরে ৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় যুদ্ধবিমান থেকে ফায়ার করা দুটি গোলা ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রেজু আমতলী বিজিবি বিওপি আওতাধীন সীমান্ত পিলার ৪০-৪১ এর মাঝামাঝি এলাকায় পড়ে।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, তুমব্রু পশ্চিমকুল সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে খনন করা হয়েছে বাংকার, রাখা হচ্ছে ভারী অস্ত্র। যা দেখা যায় তুমব্রু পশ্চিমকুল সীমান্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে। তবে এ বাংকার এখন গাছপালা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ওঠানামা করছে মিয়ানমারের সেনারা। আর মাঝে মধ্যে এই বাংকার থেকে ছোড়া হয় গোলা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ গণমাধমকে বলেন, সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়ছে। এর ফলে কিছু গোলা বাংলাদেশে অভ্যন্তরে পড়ছে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের ভিতর গোলা এসে পড়তে পারে না। এ জন্যই আমাদের প্রতিবাদ জানাতেই হবে।

রোহিঙ্গা প্রবেশের আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্দেহে যে কোনো কিছু করা যেতে পারে। আপাতভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি তারা যুদ্ধ করছে, আমাদের ভিতরে মাঝে মধ্যে গোলা এসে পড়ছে। এটিতে তাদের আরো সতর্ক হতে হবে। বাংলাদেশের সব সময় খেয়াল রাখতে হবে এতে উদ্দেশ্যমূলক কোনো কিছু আছে কিনা। কোনো কিছু পেলেই আমাদের আরও তৎপর হতে হবে। কারণ আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের কোনো হানি কেউ ঘটাক, সেটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ গণমাধ্যমকে বলেন, এক মাস ধরে প্রতিদিন সীমান্তের ওপার থেকে গোলাগুলির শব্দ আসছে। গত কয়েক দিন যুদ্ধবিমান আর হেলিকপ্টার থেকে গোলা ছুঁড়তে দেখা গেছে। কিন্তু মিয়ানমার অংশে গুলির শব্দ আর থেমে থেমে মর্টারশেলের বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠছে তুমব্রু সীমান্ত। কখনো তাদের মর্টারশেল উড়ে আসছে এ পাড়ে। গত শুক্রবারও উড়ে আসে মিয়ানমারের একটি গোলাবরুদ। সীমান্তে গা ঘেঁষে টহল দেয় সেদেশের সেনাবাহিনী। 

উখিয়ার পালংখালী অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির নেতা রবিউল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে সংঘর্ষ চলছে, সেটার অজুহাতে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছেন। প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা আসছেন। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমারের বলিবাজার ও সাপ বাজার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ পালিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, এখন পর্যন্ত এ রকম কোনো তথ্য আমরা পাইনি। বিষয়টি দেখছি।

৪০ নম্বর সীমান্ত পিলারের রাবার বাগান শ্রমিক গোলাম মাওলা (৪৫)। তিনি বলেন, গত মাসে বাগানে দুটি মর্টারশেল এসে পড়ে। প্রায় সময় আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দিতে নিচে গুলি বর্ষণ করছিল। মাটি থেকেও ওপরের দিকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। দূরের আকাশে চার-পাঁচটি যুদ্ধবিমান চক্কর দিয়ে হেলিকপ্টারকে পাহারা দিচ্ছিল। হেলিকপ্টার থেকে শত শত গুলি ও মর্টারশেল নিক্ষেপ করা হয়। বিকট শব্দে ওই এলাকায় অবস্থান না করে তুমব্রু বাজারের দিকে পালিয়ে এসেছে শ্রমিকরা।

শুনছি মায়ানমারে বাংলাদেশ সীমান্তে পাশে থাকা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির সভাপতি উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান হামিদুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ভারত, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছে। মিয়ানমার থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা আসলে উখিয়াবাসীর আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, রোহিঙ্গারা ইয়াবা ব্যবসা, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাস, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে স্থানীয়দের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আমরা স্থানীয়রা বিপদে আছি, আমরা কোথায় যাব? বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সিলগালা করে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। 

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা ফেরদৌস গণমাধ্যমকে বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আমি স্থানীয় চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে শুনেছি, এখনো কোনো মিয়ানমারের নাগরিক অনুপ্রবেশ করতে পারেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় এলাকাবাসীদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার ০৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে কক্সবাজারে হিউম্যান রিলিফ ফাউন্ডেশন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, সীমান্ত আইন-লঙ্ঘন নিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের উত্তপ্ত পরিস্থিতি গভীরভাবে অবলোকন করা হচ্ছে। নতুন করে আর একজন রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। এজন্য সতর্ক রয়েছে বিজিবি।

0 মন্তব্যসমূহ

-------- আমাদের সকল পোস্ট বা নিউজ বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা থেকে নেয়া - প্রতিটি পোস্টের ক্রেডিট সেই পোস্টের শেষ ভাগে দেয়া আছে।