মাতারবাড়ীতে শততম জাহাজ ভিড়বে আজ

মাতারবাড়ীতে শততম জাহাজ ভিড়বে আজ

কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। গত জুনে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পাশেই মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্মিত জেটিতে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাহাজ ভেড়ানো শুরু হয়। আজ বুধবার এই জেটি শততম জাহাজ ভেড়ার মাইলফলক অর্জন করবে।

মাতারবাড়ীতে শততম জাহাজ ভেড়ার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় দুই কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে মাতারবাড়ীতে দুটি স্থায়ী জেটি আছে। এগুলো মূলত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণসামগ্রীপরিবহনের জন্যই ব্যবহৃত হবে। আগামী বছর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দুই জেটিতে কয়লাবোঝাই জাহাজ ভিড়তে শুরু করবে। এতে রাজস্ব আয় তখন অনেক বেড়ে যাবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নির্দেশনায় দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের এই অনন্য কাজটি শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলে এই জেটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাহাজটি পণ্য নিয়ে ভিড়তে পারবে। মাতারবাড়ী হয়ে উঠবে আশপাশের দেশগুলোর পণ্য পরিবহন হাব। ’

২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর মাতারবাড়ীতে নির্মিতব্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জেটিতে প্রথম জাহাজ ভেড়ানো শুরু হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণসামগ্রী বোঝাই করেই প্রথম ভেড়ে ‘ভেনাস ট্রায়াম্প’ জাহাজ। এর মধ্য দিয়ে মাতারবাড়ী এলাকায় বড় জাহাজ ভেড়ানোর যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৫ জুলাই নতুন একটি জেটি চালু হয় সেখানে। এর পর থেকে দুটি জেটিতে দুটি করে জাহাজ ভেড়ানো শুরু হলে জাহাজের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯ মাসের মাথায় শততম জাহাজ ‘হোসেই ফরচুন’ ভিড়ছে জেটিতে।

এম শাহজাহান বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা সীতাকুণ্ড থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত ৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে এই সীমার মধ্যে যত জাহাজই পণ্য নিয়ে জেটিতে ভিড়বে সেটি চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় বা পোর্ট অব কল হিসেবে গণ্য হবে। সেই জেটিতে ৯৯টি পণ্যবাহী জাহাজে এক লাখ ১৭ হাজার টন পণ্য ওঠানামা হয়েছে। এর বিপরীতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে দুই কোটি আট লাখ টাকা। আগামী বছর থেকে শুধু কয়লাবাহী জাহাজ ভিড়লেই চট্টগ্রাম বন্দরের আয় অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলছেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেক বেশি ত্বরান্বিত হবে। শুধু বাংলাদেশ নয়; আশপাশের দেশগুলো একে ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। সঠিক সময়ে চালু করা হলে অন্য উচ্চতায় দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর চালুর পাশাপাশি মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পে। এর মধ্যে মাতারবাড়ী থেকে সড়কপথে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের সঙ্গে মাতারবাড়ীর সংযোগ স্থাপন হবে। একই সঙ্গে নৌপথেও যোগাযোগের পরিকল্পনা আছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের নুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর নির্মাণের আগেই সড়ক, রেল, নৌপথে পণ্য পরিবহনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে সুফল পেতে গিয়ে আমরা হোঁচট খাব। ’

জানা গেছে, মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ করছে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার জাহাজ ভেড়ানোর পরিকল্পনা করতে গিয়ে বাণিজ্যিক বন্দর নির্মাণের বিষয়টি উঠে আসে। পরে জাইকা সম্ভাব্যতা যাচাই করে।

জাইকার প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে ১৬ মিটার গভীর ও আড়াই শ মিটার দীর্ঘ জাহাজ মোট আট হাজার একক কনটেইনার পণ্য নিয়ে ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার একক কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়তে পারে। ফলে মাতারবাড়ীতে চট্টগ্রাম বন্দরের আড়াই থেকে তিন গুণ বড় জাহাজ ভিড়তে পারবে।

মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে রয়েছে দুটি টার্মিনাল। সাধারণ পণ্যবাহী ও কনটেইনার টার্মিনালে বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) ভিড়তে পারবে, যেটি এখন বাংলাদেশের কোনো বন্দর জেটিতে ভিড়তে পারে না। প্রথম ধাপে বন্দর ও পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক নির্মাণসহ খরচ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২০২৬ সাল। দ্বিতীয় ধাপে নির্মিত হবে তিনটি কনটেইনার টার্মিনাল। পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে টার্মিনাল।

মাতারবাড়ীতে জাইকার প্রস্তাবে একমত হয়ে সরকার ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘নিপ্পন কোয়ে’র সঙ্গে চুক্তি করে। প্রতিষ্ঠানটির জমা দেওয়া সমীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এখন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের দরপত্র ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসান বলছেন, ‘বন্দর নির্মাণের জন্য জুন মাসে দরপত্র ডাকা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে জমা দেওয়ার শেষ সময়। এরপর আবেদন বাছাই করে মূল্যায়ন শেষ করে ১৮০ দিনের মধ্যে ঠিকাদার নির্মাণ চূড়ান্ত করার সময় বেঁধে দেওয়া আছে। আমরা সেভাবেই আগাচ্ছি। 

Advertisement