জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেই যখন নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ জীবন বাজি রেখে রক্ষা করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ফিল্ম ডিভিশনের সহকারী ক্যামেরা পারসন আমজাদ আলী খন্দকার। কালজয়ী সেই ভাষণ যারা রেকর্ড করেছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম।

৭ মার্চ উপলক্ষে কথা বলেছেন ৮৯ বছর বয়সী আমজাদ আলী খন্দকার।   বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড এবং রক্ষার সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনায জনাব আমজাদ আলী খন্দকার বলেন, ৬ মার্চ আমাদের ফিল্ম ডিভিশনের পরিচালক আবুল খায়ের মহিবুর রহমান আমাদের ডেকে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করতে বলেন।

আমরা মোট সাত জন ৭ মার্চের ভাষণ রেকর্ড করেছিলাম। ক্যামেরাম্যান ছিলেন জি জেড এম এ মবিন ও এম এ রউফ। অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম আমি, এস এম তৌহিদ আর সৈয়দ মইনুল আহসান। দুজন লাইটবয় ছিল জুনায়েদ আলী ও হাবিব চোকদার। যার মধ্যে আমি আর মমিন সাহেব দুজনে একটি ক্যামেরা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করি।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

রউফ সাহেব এবং তৌহিদ আরেকটি ক্যামেরা দিয়ে রেসকোর্স ময়দানের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে উপস্থিত জনতার ভিডিও করেন। একজন সহকারী ক্যামেরাম্যান অডিও রেকর্ড করেন। আমাদের সঙ্গে দুই লাইটম্যানও ছিল।

সেদিনবঙ্গবন্ধু এসে দেখলেন মানুষে পরিপূর্ণ মাঠ  এবং আশেপাশে মানুষ আর মানুষ । তিনি কী নির্দেশ দেন তা শুনার জন্য অধীর আগ্রহে সবাই। বঙ্গবন্ধু বীরের মতো এসে মঞ্চে উঠলেন। আশপাশে কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে সরাসরি ডায়াসে উঠে ভাষণ শুরু করলেন। একটানা,  কোনো স্লিপও না নিয়ে অনর্গল কথা বলে গেলেন। আর যা বললেন, তা তো রেকর্ডে আছেই, সবাই যা শুনছেন।  

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেকর্ড শেষে রাতে আমরা অফিসে আসি। ভাষণের রেকর্ড করা ফিল্ম অফিসে রাখি। আমাদের অফিসে ল্যাব ছিল না। এফডিসি থেকে ফিল্ম ডেভেলপ করে আনতে হতো। তখন বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো কিছু, কোথাও লেখা যেত না। তাই আমরা কৌশল করে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ভিডিও সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, নির্বাচন, অথবা অন্য কোনো ডকুমেন্টারির নাম দিয়ে গোপনে এফডিসি থেকে ভিডিও ডেভেলপ করে আনতাম এবং চিহ্ন দিয়ে রাখতাম কোনটাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভিডিও আছে।

এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর অনেক ঘটনা ঘটে গেল। ২৫ মার্চ পা*কিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর আ*ক্রমণ করলো। বঙ্গবন্ধুকে আটক করা হলো। সবাই যে যার মত পালাতে লাগল। ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হাম*লার পরদিন থেকে বিভিন্ন অফিস-আদালতে দায়িত্ব নিতে শুরু করে পা*কিস্তানি হানা*দাররা। চলচ্চিত্র বিভাগের মুক্তিকামী কর্মীরা ধারণা করলেন, পাকিস্তানি সেনারা যদি হানা দেয়, তাহলে এসব ধ্বংস করে দেবে। সে কারণে কীভাবে এগুলো সচিবালয়ের আর্কাইভ থেকে সরানো যায় সেই পরিকল্পনা করলেন বিভাগের প্রধান মহিবুর রহমান। 

১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল মহিবুর রহমান সাহেব আমাকে ডেকে বলেন, `আমজাদ তোমাকে একটা দায়িত্ব দেব।' আমি বলছি, `কী দায়িত্ব স্যার?' আমজাদ তোমাকে এখনই একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে হবে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ছবি ও ফিল্মগুলো নিয়ে। তিনি আমাকে একটি ট্রাংক কেনার জন্য টাকা দিলেন। আমি সদরঘাট থেকে কালো রঙের ৪২ ইঞ্চি একটা ট্রাঙ্ক কিনে আনলাম। ট্রাংকের ভেতর বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ছবি এবং ৭ মার্চের ভাষণ ভর্তি করলেন। তখন আমি বাবাকে বলে এলাম, ঢাকার বাইরে যাচ্ছি অফিসের কাজে। কয়েক দিন দেরি হবে যেন চিন্তা না করে।

বাবাকে বলে আসার পর খায়ের সাহেব আমাকে তার রুমে নিয়ে গেলেন। এরপর তিনি আমার হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বললেন, আমজাদ! আল্লাহাফেজ। খায়ের সাহেবের চোখগুলো তখন অনেক বড় বড় মনে হচ্ছিল। তিনি ভেবেছিলেন আমি হয়তো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে মারা যেতে পারি।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

তখন সচিবালয়ের প্রতিটা গেটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাহারায় ছিল। শুধু সেকেন্ড গেটে সার্জেন্ট ফরিদ নামে একজন বাঙালি অফিসার ছিলেন। সেকেন্ড গেট দিয়ে সে সময় গাড়ি সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকতে পারত, কিন্তু বের হতে পারত না। সার্জেন্ট ফরিদকে তখন বলা হলো আমরা এই কাজ করবো, আমাকে একটু বের করে দিয়েন।

তখন উনি বলেন, আপনি আমাকে ইঙ্গিত দিলে আমি আপনাকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেব। আমি তখন পরিচিত কয়েকজনকে বললাম, আমাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসতে। কিন্তু তারা শুধু ট্রাংকটা বেবিট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিল, কেউ আমার সঙ্গে এলো না। আমি সার্জেন্ট ফরিদকে ইশারা দিতেই তিনি পল্টনের দিক থেকে যে গাড়িগুলো আসে, সেগুলোকে হাতের ইশারায় বন্ধ করে দিয়ে আমার বেবিট্যাক্সিকে সিগন্যাল দিয়ে সচিবালয় থেকে বের করে দিলেন।

প্রেসক্লাবের উল্টো পাশে আমেরিকান সেন্টারের কাছে এসে দেখি ট্রাকের ওপরে পা*কিস্তানি সেনাবাহিনী ফিতা লাগানো মেশি*নগান তাক করে বসে রয়েছে। আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে সেনাবাহিনীর সামনে দিয়েই পার হলাম। কার্জন হলের পাশ দিয়ে চকবাজার হয়ে সোয়ারীঘাটে পৌছালাম। সোয়ারি ঘাটে একজন কুলিকে দিয়ে ট্রাংক নৌকায় তুললাম। এরপর জিনজিরা বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখানে দেখি মানুষ জান বাঁচাতে এদিক সেদিক পালাচ্ছে। রাস্তায় দেখলাম অনেক মানুষকে মে*রে ফেলে রাখা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

 জিনজিরা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই দেখি একটি বাস ছেড়ে যাচ্ছে। আমি তখন বাসের পিছনে হাত দিয়ে জোড়ে জোড়ে থাপ্পড় দিলাম। ড্রাইভার তখন আমাকে দেখে বাসটি থামায়। ড্রাইভার আমাকে হাতের ইশারায় বাসের ছাদে উঠতে বলল। আমার ভিতর তখন ভয় কাজ করছে যে, আমার পিছনে কেউ রয়েছে কিনা। ভয়ে ভয়ে বক্সগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে নামলাম। এরপর যাব কিসে? দেখি রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই। তখন এক ঘোড়াওয়ালাকে দেখে বললাম, বাবা আমাকে একটু নিয়ে যেতে পারবা। এরপর ঘোড়ার পিঠে ট্রাংক রেখে আমরা দুইজন দুই পাশ থেকে ট্রাংক ধরে হাঁটতে লাগলাম। এভাবে প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার গেলাম। নিরাপত্তার ভয়ে নৌকায় যাইনি।

দোহার থানার জয়পাড়া গ্রামের মজিদ দারোগার বাড়িতে ট্রাংক রাখি। মজিদ দারোগাকে মহিবুর সাহেব আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন।

সেদিন আমি আমার নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি। নিজের পরিবার-পরিজন বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানদের কথাও ভাবিনি। শুধু দেশ এবং বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসার কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমি এ কাজটি করেছিলাম। মহিবুর সাহেব আমাকে খুঁজতে খুঁজতে দোহারে এসে পৌঁছান।

এরপর আবার যখন দোহার থানায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পৌঁছে যায়, তখন খায়ের সাহেব নিরাপত্তার জন্য দোহার থেকে আরও ভিতরে চরকোষা গ্রামের অমেদ খাঁ এবং দানেশ খাঁ নামের দুই ভাইয়ের বাড়িতে ধানের গোলার ভেতরে ট্রাংকটি লুকিয়ে রাখেন। এরপরের দিন মহিবুর সাহেব ভারতে চলে যান।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

ভারতে গিয়ে মহিবুর সাহেব ইন্ডিয়ান হাই কমিশন এবং মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, ধানের গোলা থেকে ট্রাংকটি মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে ভারতে নিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণের ভিডিও ক্যাসেট ভারতেই ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খায়ের সাহেব দেশে ফিরে আসার সময় বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণও সঙ্গে নিয়ে আসেন।

এভাবেই আমজাদ আলী খন্দকার, আবুল খায়ের মুহিবুর রহমানসহ অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রক্ষা পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। যে ভাষণের মাধ্যমে তিনি বাঙালিকে পা*কিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। যে ভাষণ আজ শুধু বাঙালি জাতির নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম," স্বাধীনতার দাবিতে এভাবেই গর্জে উঠেছিল আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্র কণ্ঠ।

0 মন্তব্যসমূহ