ধর্ষণের মহাসড়কে বাংলাদেশ |

ধর্ষণের মহাসড়কে বাংলাদেশ

২০১৭ সালের আগস্ট মাসের এক নিকষ কালো রাতে ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজের ছাত্রী রুপাকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ শেষে হত্যা করেন সেই বাসের দায়িত্বে থাকা হেলপার ও সুপারভাইজাররা। পরদিন ঘাড় মটকানো সেই মৃতদেহ শালবনের গভীর থেকে উদ্ধার করা হয়।

২০১৯ সালের ৬ মে ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে তাঁর নিজ বাড়ি কিশোরগঞ্জে যাওয়ার পথে স্বর্ণলতা নামের একটি বাসে হেলপারসহ পাঁচ-ছয়জন মিলে ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে হত্যা করেন। তানিয়ার আর বাড়িতে ফেরা হয়নি। ২০১৫ সালের মে মাসে কর্মক্ষেত্র যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে ফিরছিলেন এক গারো তরুণী। কুড়িল বাসস্ট্যান্ড থেকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে তাঁকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে মাইক্রোবাসের চালকসহ পাঁচ দুর্বৃত্ত। 

সেই সময় মাইক্রোবাসটি ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ঘুরতে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর গাড়ি থেকে তরুণীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়; কিন্তু থামে না গণপরিবহনে ধর্ষণ। ৪ আগস্ট কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ঈগল পরিবহনের একটি নৈশকোচে ডাকাতি ও দলবদ্ধ ধর্ষণের রক্ত হিম করা ঘটনা যেন ভয়ের সিনেমাকেও হার মানায়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই চলন্ত বাসে আরেকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে। তাকওয়া পরিবহনের একটি বাসে নির্যাতনের শিকার হন নওগাঁ থেকে আসা এক দম্পতি। স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে স্ত্রীকে বাসের ভেতরেই ধর্ষণ করেন ওই বাসের পাঁচ কর্মী।

যেন ধর্ষণের মহোৎসব শুরু হয়েছে দেশে! কিছুতেই থামছে না ধর্ষণ। ধর্ষণ হচ্ছে মাঠে-ময়দানে, হোটেলে, রেস্তোরাঁয়, বসতবাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাস্তার ধারে, চলন্ত গাড়িতে। গণপরিবহনে বেড়েই চলেছে যৌন হয়রানি আর ধর্ষণের ঘটনা। ২০১৭ সালে ব্র্যাক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে, ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে কিংবা উন্মুক্ত স্থানে কখনো না কখনো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। 

গণপরিবহনগুলো যেন যৌন নির্যাতন আর ধর্ষণের চলমান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শুধু গণপরিবহনেই ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ১৩৪টি। অন্যদিকে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৪৬ নারী ও মেয়েশিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭ নারীকে। এ ছাড়া আরও ৭২ নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। একই সংস্থার হিসাব অনুসারে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ধর্ষণ বেড়েছে ১২২ শতাংশ। ২০১৮ সালে ৭৩২, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩, ২০২০ সালে ১ হাজার ৬২৭ এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৩২১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

মনে পড়ে, গত বছর অক্টোবরে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দোলনের রেশ ধরে সেই মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এ সংশোধন আসে। এতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। তখনই আশঙ্কা করা হয়েছিল, আইনের এই সংশোধন ধর্ষণের প্রতিকারে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে না। সেই আশঙ্কাই অবশেষে সত্য হয়েছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেখানে সীমাবদ্ধতা, সেখানে আইনের সংশোধন অবস্থার পরিবর্তনে তেমন কোনো প্রভাব রাখবে না, এটাই স্বাভাবিক। আইন প্রয়োগের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আইন সংশোধন করে কোনো লাভ হয় না।

প্রথম আলো ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাকা নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আসা মামলার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এতে দেখা যায়, সেই ১৫ বছরে ধর্ষণের ৩টি ধারায় মোট ৫ হাজার ৫০২টি মামলার মধ্যে নিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৮৯৮। এসব নিষ্পন্ন মামলায় সাজা পেয়েছেন মাত্র ৮৭ জন। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধে করা মামলার ক্ষেত্রে সাজা হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশের। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ ধর্ষণ মামলায় কোনো সাজা হয়নি। বিচারহীনতাই যখন আজকের সংস্কৃতি, তখন ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন—এ যে কী ভীষণ লজ্জার! নারীরা কোন অপরাধে প্রতিদিন এ ধরনের পৈশাচিকতার শিকার হচ্ছেন, তার জবাব দিতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের। কোনো ধর্ষণের জনপদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন হয়নি এ দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকার অর্থ হলো দেশের উন্নয়নের গতি অর্ধেক হয়ে যাওয়া। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে মোড়কে আবদ্ধ আইনের সঙ্গে ড্রয়িংরুমের সাজানো শোপিসের তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখার জন্য আইনের সৃষ্টি হয়নি। বরং আইনের যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকের নিরাপদ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত থাকে আইনের সার্থকতা।

ধর্ষণ যেভাবে তার আপন গতিতে হয়েই চলেছে, তাতে মনে হচ্ছে, এ গতিকে ঠেকানোর যেন কেউ নেই। এত এত ধর্ষণের দায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো রাতে ঘুমান কী করে? তাঁরা কি কখনো অনুভব করেন ধর্ষণের দুঃসহ স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে জীবন পার করার অভিশাপ? তারা কি একবারের জন্যও অনুভব করেন প্রতি মুহূর্তে ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির ভয় নিয়ে পথ চলার কী নিদারুণ যন্ত্রণা? হয়তো নিজেরা ক্ষমতায় আছেন বলে এসব দীর্ঘশ্বাস, কষ্ট ও যন্ত্রণা তাঁদের সুরক্ষাবলয়ে ছায়াও ফেলে না।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কিছুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। অপরাধীর কঠোরতম সাজার বিষয়টি আইন দ্বারা নির্ধারিত হলেও আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ভুক্তভোগীরা কখনোই আইনের সুফল লাভ করবে না। আইন প্রণয়ন, তার সংশোধন ও যুগোপযোগী করার পরও নারীরা যদি অরক্ষিত থাকেন, তবে অবশ্যই আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। আমরা শুধু আইন চাই না, চাই আইনের সঠিক ও সর্বোচ্চ প্রয়োগ। ধর্ষণের মহাসড়কে যে আজকের বাংলাদেশ, সেই যাত্রার শেষ আদৌ কি কখনো হবে?

0 মন্তব্যসমূহ