ইসি অর্ধেক নির্বাচন সুষ্ঠু করতে চায়।



অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএমে বিশ্বাস করছে না। এর ভেতরে কী জানি একটা আছে। আমরা অনেককেই আস্থায় আনতে পারছি না। ইভিএম বিষয়ে সংকট থেকে যাবে।’ এই বক্তব্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের। গত ৩১ জুলাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট দাবি করার পর সিইসি এই মন্তব্য করেছিলেন।

তারপর ২২ আগস্ট দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে আসা সুপারিশের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। সিইসির স্বাক্ষরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনেও ইভিএমের বিষয়ে বলা ছিল, ইভিএমের বিষয়ে কমিশন স্থির কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু এর এক দিন না যেতেই কমিশন সিদ্ধান্ত দিল, আগামী নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ভোট হবে ইভিএমে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসেছে, কী এমন হলো যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন কমিশন এমন একটি বিতর্কিত বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে চলে এল? সংলাপের পর ইভিএম বিষয়ে অনাস্থা সংশয় দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তারা কোনো ধরনের যোগাযোগ করেছে বলেও জানা যায়নি। অবশ্য সিইসি স্বীকার করেছেন, কে কী বলল, তা মুখ্য ছিল না। ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য বিবেচনায় এসেছে সুষ্ঠু ভোট।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই কমিশন ইভিএমের পক্ষে নানাভাবে যুক্তি দিয়ে আসছে। বলা যায়, সাফাই গাইছে। তাদের প্রধান যুক্তি হচ্ছে, ইভিএমে কারচুপির সুযোগ নেই, জাল ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। যদিও বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে আসছে যে ইভিএম একটি ‘কারচুপির যন্ত্র’।

এই তর্কবিতর্কের মধ্যেই সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এমনিতেই দেশে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় সংকট চলছে। এর মধ্যে এই ইভিএমে ভোট করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে ইসি সে সংকটকে আরও বড় করে তুলছে। অবশ্য ইসি বলছে, সংকট হয় কি না, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সিইসি সাংবাদিকদের সংকট হয় কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিজেও সংকটের অপেক্ষায় থাকবেন।

ইসির সিদ্ধান্ত ও সিইসির বক্তব্যে কয়েকটি প্রশ্ন জাগে। প্রথমত, ইসি কি আগেভাগেই স্বীকার করে নিচ্ছে যে তারা কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ঠেকাতে পারবে না? সংবিধান, জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় ইসিকে যে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার ব্যবহার তারা করতে অক্ষম?

নির্বাচনে অনিয়ম–কারচুপি ঠেকাতে ইসিকে যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দেওয়ারও ক্ষমতা আছে। এমনকি নির্বাচনও বাতিল করে দিতে পারে কমিশন। তারা তাদের সেসব ক্ষমতা সম্পর্কে জানে না, এমনটা ভাবা বোকামি। তবে তারা সে ক্ষমতা প্রয়োগে কতটুকু সচেষ্ট হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা কমিশনই করে দিচ্ছে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। তারাও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু সিইসির কথায় মনে হচ্ছে, কমিশন অর্ধেক নির্বাচন সুষ্ঠু করতে চায়। কারণ, সিইসির ভাষায়, ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ছিল ‘সুষ্ঠু ভোট’। অর্থাৎ যে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট হবে, সেখানে সুষ্ঠু ভোট হবে। কারণ, ইভিএমই একমাত্র যন্ত্র, যেটাতে ভোট তুলনামূলক অনেক সুষ্ঠু করা যাবে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। তাহলে বাকি যে ১৫০ আসন, সেখানকার প্রার্থী, ভোটারদের কী দোষ? তাঁরা কী করবেন? তাঁরা কি এখন থেকেই কেউ তলোয়ার নিয়ে আর তার পাল্টায় অন্যরা রাইফেল নিয়ে মাঠে নেমে যাবেন? কারণ, জাল ভোট, কেন্দ্র দখল—এসব তো করতে হবে বা ঠেকাতে হবে।

সিইসিকে আমি এই প্রশ্ন রেখেছিলাম, যেহেতু আপনারা বলছেন, ইভিএমে ভোট সুষ্ঠু হবে। তাহলে কেন ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করছেন। ৩০০ আসনেই কেন করছেন না? সবখানেই তো সুষ্ঠু ভোটের প্রয়োজন। জবাবে সিইসি বলেছিলেন, এখানে নির্বাচন কমিশনের সামর্থ্যের বিষয় আছে।

কথাটা সত্য। কিন্তু এর ভেতরেও কথা আছে। ইচ্ছা থাকলে নাকি উপায় হয়। উপায়টা আমরা একটু পরে বলছি। তার আগে দেখি কমিশনের সক্ষমতা কতটুকু।

নির্বাচন কমিশন বলে আসছে, এখন তাদের হাতে দেড় লাখ ইভিএম আছে। সেগুলো দিয়ে ৭০–৮০টি আসনে ভোট করা সম্ভব হবে। ১৫০ আসনে ভোট করতে হলে আরও দেড় থেকে ২ লাখ ইভিএম প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর।

আগে দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ইসিকে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিতে হয়েছিল। এখন ১৫০ আসনে করতে হলে এ রকম আরেকটি বড় প্রকল্প নিতে হবে। আর যদি ৩০০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে হয়, তাহলে তো ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে।

এমনিতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক নয়। সরকার নানাভাবে কৃচ্ছ্রসাধনের চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় এত বিপুল টাকা খরচ করাটা কতটুকু সমীচীন, সেটাও ভাবার বিষয়। সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররাও হয়তো সেটা মাথায় রেখেছেন।

এবার আসি আগে উল্লেখ করা উপায়ের বিষয়ে। এখন ইসির হাতে যে ইভিএম আছে, তা দিয়েই ৩০০ আসনে ভোট করা সম্ভব। আর একটি ইভিএমও নতুন করে কিনতে হবে না। কোনো আইনেরও প্রয়োজন হবে না। বরং এটি করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও বেশি সংখ্যায় মোতায়েন করা যাবে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে।

উপায়টি হলো একাধিক দিনে ভোট গ্রহণ। আমাদের আরপিওতে একাধিক দিনে ভোট গ্রহণের সুযোগ এখনই আছে। সুতরাং আইনি কোনো ঝামেলাই নেই। অনেক দলও একাধিক দিনে ভোট নেওয়ার কথা বলে আসছে।

তা ছাড়া ইসির কাছে যেহেতু রাজনৈতিক দল বা কে কী বলল, তা মুখ্য নয়, আর এই বিবেচনা থেকেই ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেহেতু তারা কারও মতের তোয়াক্কা না করে একাধিক দিনে ভোট গ্রহণের দিকে যেতে পারে। কারণ, মানুষ ৩০০ আসনেই সুষ্ঠু ভোট চায়। অর্ধেক সুষ্ঠু, অর্ধেক সুষ্ঠু নয়।

এখন নির্বাচন কমিশনের সামর্থ্য আছে ৭০–৮০টি আসনে ইভিএমে ভোট করার। এই সামর্থ্য হলো যদি একই দিনে ৩০০ আসনে ভোট হয়। আর যদি আলাদা আলাদা ৪ দিনে ভোট গ্রহণ করা হয়, তা হলে ১ দিনে ৭৫টি করে আসনে ভোট হবে। সব কটি আসনেই ইভিএমে ভোট নেওয়া যাবে।

কিন্তু এই পথে নির্বাচন কমিশন হাঁটবে, এমনটা মনে হয় না। তখন অন্য অনেক দলের মতামতের বিষয় আসবে। আর তখন আড়ালে দুষ্টু লোকেরা এই প্রশ্ন তুলতে পারবেন, তাহলে ইভিএম কেনাকাটা করাটাই কি নির্বাচন কমিশনের মুখ্য উদ্দেশ্য?

Advertisement