চীনের সামরিক মহড়ায় উদ্বেগ বেড়েছে

বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত : চীনের সামরিক মহড়ায় উদ্বেগ বেড়েছে

তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক মহড়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মালামাল ও পণ্য পরিবহনের প্রধান রুটগুলোয় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো মহড়া শুরু হওয়ার পর চীনের অনেকগুলো জাহাজ ও বিমান তাইওয়ান প্রণালির মধ্যরেখা অতিক্রম করেছে বলে তাইপের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ ও জাহাজ মালিকরা ওই এলাকায় ভ্রমণকারী জাহাজ ও বিমানকে বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে বলেছে।

গত বৃহস্পতিবার তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে তাইওয়ান বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। চীনের সামরিক মহড়া চলাকালে নিকটবর্তী আকাশপথে বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় এয়ারলাইন্সগুলো তাইপেমুখী ফ্লাইট বাতিল করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, মহড়া চলায় তাইওয়ানের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এয়ার এবং এশিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে পণ্য ও তেলবাহী জাহাজ দ্বীপটি ঘুরে নতুন রুট ধরে যাচ্ছে। এতে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে বলে জাহাজ মালিকরা


জানিয়েছেন। ১৮০ কিলোমিটার প্রশস্ত তাইওয়ান প্রণালি ও তাইওয়ান দ্বীপের পূর্ব পাশের জলপথ উত্তর-পূর্ব এশিয়া (চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যদি কোনো সংঘাত শুরু হয়, তা বিশ্ব বাণিজ্যে যে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করিয়ে দিচ্ছে চীনের এ মহড়া। জাহাজ মালিক সমিতি বিআইএমসিওর প্রধান বিশ্লেষক নিলস রাসমুসেন বলেন, কিছু জাহাজ এরই মধ্যেই প্রণালির ভেতর দিয়ে না গিয়ে পূর্ব পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সংঘাত জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট গ্রহণে বাধ্য করতে পারে, এতে পরিবহনে বেশি সময় লাগে, সময়সূচি ব্যাহত হয় এবং বিলম্ব ও খরচ বেড়ে যায়।

ট্যাংকার গবেষণা বিষয়ক প্রধান অনুপ সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার পর থেকে বৃহৎ তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর মালিকরা সতর্কতার স্তর বাড়িয়েছেন এবং জাহাজগুলোকে অন্যপথে নিয়ে যাচ্ছেন। শিপিং ইন্স্যুরেন্স গোষ্ঠীগুলো তাদের সদস্যদের সতর্কবার্তা পাঠিয়ে তাইওয়ানের আশপাশ দিয়ে চলার সময় জাহাজগুলোকে সাবধান থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

উদ্বেগ বেড়েছে চীনের সামরিক মহড়ায় : চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, তাইওয়ানের চারপাশে ছয়টি অঞ্চলে একই সঙ্গে সাগরে তাজা গোলার মহড়া ও বিমান মহড়া চলছে। সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, বোমারু বিমানসহ শতাধিক যুদ্ধবিমান মহড়ায় অংশ নিয়েছে। মহড়ার প্রথম দিনে তাইওয়ানের চারপাশের জলসীমায় চীনা রকেট থেকে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর এমন ঘটনা এবারই প্রথম। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, অঞ্চলটি লক্ষ্য করে ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এগুলো ডংফেং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বলে শনাক্ত হয়েছে। জাপান বলছে, ইইজেডে কমপক্ষে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে।

তাইওয়ানে হামলা আদৌ হবে কি? চীনের নজিরবিহীন মহড়ার কারণে আবারও প্রশ্ন উঠেছে, বেইজিং তাইওয়ানে হামলা চালাবে কিনা? বিশেষ করে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গেøাবাল টাইমসে যেসব বিশেষজ্ঞ মত প্রকাশ হচ্ছে, তাতে দেখা গেছে, এ মহড়াকে ‘পুনর্মিলনের মহড়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। বিভিন্ন গুঞ্জন সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, চীন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কেউই চায় না তাইওয়ানে যুদ্ধ হোক। অন্তত শিগগিরই যুদ্ধ বাধুক তা তারা চায় না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফান্ডের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক বোন্নি গেøজার বলেন, চীনের রেডলাইনকে চ্যালেঞ্জ করে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানকে সতর্ক করতে চাইছে চীন।

বোন্নি আল জাজিরাকে বলেন, তাইওয়ানে অবরোধ আরোপের সক্ষমতা জানান দিচ্ছে তারা। তবে শি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন না। চীন যদি জোর করে তাইওয়ানের দখলও নিতে চায়, এতে উল্লেখজনক ঝুঁকি রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ১০ হাজারের বেশি সেনা নিয়ে চীনা বাহিনীকে তাইওয়ান প্রণালি অতিক্রম করতে হবে। তখন তারা বিমান ও জাহাজ থেকে ছোড়া বোমা হামলার শিকার হতে পারেন। সেনারা যদি তাইওয়ানের উপকূলে পৌঁছেও যায়, তারপরও তীরে নামতে তাদের বেগ পেতে হবে। কারণ অসমতল উপকূল রেখায় তাদের সশস্ত্র সেনা, সাঁজোয়া যান, ট্যাংক ও গোলাবারুদ নামানোর মতো উপযুক্ত তীর এলাকার সংখ্যা হাতে গোনা।

এছাড়া চীন তাইওয়ানে আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও বড় ধরনের সংঘাত বেধে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও ১৯৭৯ সালের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী, দেশটি দ্বীপ অঞ্চলটিকে সহযোগিতা করতে বাধ্য। গত মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, চীন আক্রমণ করলে তাইওয়ানের সুরক্ষায় সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

0 মন্তব্যসমূহ