সাম্প্রদায়িক হামলায় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

সাম্প্রদায়িক হামলায় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

দেশে বারবার সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, সংখ্যালঘুদের ওপরে হামলা বন্ধ না হলে বৃহত্তর আন্দোলন করে অধিকার আদায়ের ডাক দেওয়া হবে।

সম্প্রতি নড়াইলে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেন, বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা মোকাবিলা করতে রাজনৈতিক-সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকার পরও একের পর এক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সরকারের বারবার আশ্বাসের পরেও এ হামলা বন্ধ হচ্ছে না। প্রশাসনের নির্বিকার থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। 

তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কোনো দিক থেকেই নিরাপদ নয়। তারা একদিকে যেমন হামলার শিকার হচ্ছে, অপরদিকে সরকারের দিক থেকেও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে না। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হয়।

সমাবেশে বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হারিয়ে ফেলছে। ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করার কোনো কারণ নেই, কেননা এই নড়াইলেই কলেজের অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। 

২০১২ সাল থেকে রামু-নাসিরনগর-অভয়নগর-শাল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-চৌমুহনী-মুন্সিগঞ্জ-নড়াইল-উত্তরাসহ সারা দেশে ধারাবাহিকভাবে যেসব সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটেছে তা বাংলাদেশকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়শূন্য করে ধর্মান্ধ দেশে পরিণত করার চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।

এদিকে নড়াইলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ গত 

শুক্রবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের সঙ্গে দেখা করেন। গতকাল শনিবার পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দারের নেতৃত্বে একটি টিম নড়াইলের দিঘলিয়ায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ঘুরে এসে চন্দ্রনাথ পোদ্দার বলেন, অনেকগুলো ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে, তারা অনেক চেষ্টা করেছে, একদিক দিয়ে বাধা দিলে অন্যদিক দিয়ে হামলা করেছে।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমাবেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নিমচন্দ ভৌমিক বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির তত্পরতা রয়েছে। যদিও সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু তাদের মোকাবিলার জন্য যা যা প্রয়োজন সেটা করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার বলেন, এখনো সময় আছে, আপনারা হস্তক্ষেপ করেন, না হলে আমরা রুখে দাঁড়াব।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ঊশাতন তালুকদারের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী, কাজল দেবনাথ, সাংগঠনিক সম্পাদক পদ্মাবতী দেবী, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জে এল ভৌমিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুমনা গুপ্তা, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব হেমন্ত আয় কোড়াইয়া, জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সদস্য সচিব পলাশ কান্তি প্রমুখ। প্রতিবাদ সমাবেশে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন।

২১ বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি

নড়াইলের সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ২১ জন বুদ্ধিজীবী বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেন, নড়াইলে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত দুটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের সমাজের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক পশুশক্তির উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশ তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে।

বিবৃতিতে সরকারকে এই সাম্প্রদায়িক সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে অন্যান্যের মধ্যে স্বাক্ষর করেন সৈয়দ হাসান ইমাম, অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, সেলিনা হোসেন, সারওয়ার আলী, ফেরদৌসী মজুমদার, আবেদ খান, মফিদুল হক, মামুনুর রশীদ, শাহরীয়ার কবীর, মুনতাসির মামুন, হারুণ হাবীব, ম. হামিদ, গোলাম কুদ্দুছ ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ।

এদিকে এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র—আসক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন এবং উদীচী। বিবৃতিতে তারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রদান ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানান।

0 মন্তব্যসমূহ