বেপরোয়া বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীরা

বেপরোয়া বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীরা

পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থার (ইন্টারপোল) রেড নোটিশপ্রাপ্ত পলাতক সন্ত্রাসীরা ফের বেপরোয়া। বিদেশে বসেই তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন দেশের অপরাধ জগত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে চলছে চাঁদাবাজি অস্ত্রবাজি এবং মাদক ব্যবসা। ঈদ সামনে রেখে তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বারবার নোটিশ করেও আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না তাদের। তাই দেশে অবস্থান করা সহযোগীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কৌশল নিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা গেছে এসব তথ্য।

জানা যায়, রেড নোটিশপ্রাপ্ত নবী হোসেন এবং আর্মি আলমগীর এক সময় মোহাম্মদপুর, আদাবর, তেজগাঁও, শেরেবাংলানগর এবং ধানমন্ডি এলাকার ত্রাস ছিলেন। নবী এখন থাইল্যান্ড এবং আলমগীর ভারতে অবস্থান করছেন। তাদের হয়ে দেশে অপকর্ম করছেন সাইফুল ইসলাম, আব্দুর রহমান, রুবেল, তরুণ, নয়ন, জহিরুল ইসলাম ওরফে জহির এবং হোসেন হাসানসহ ২০-২৫ জনের গ্রুপ। জহির, সাইফুল এবং রহমান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জালে ধরা পড়েছেন। টার্গেট করা ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে এরা ফোনে কথা বলিয়ে দেন নবী এবং আলমগীরের সঙ্গে। পরে ফোনে তারা ওই ব্যক্তির কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা সংগ্রহ করেন জহির এবং রহমান। কখনো ব্যবহার করা হয় সাইফুলের বিকাশ নম্বর। পরে চাঁদার একটি অংশ পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিদেশে। সম্প্রতি ডিপিসির প্রকৌশলী রাজ্জাক এবং চন্দ্রিমা উদ্যানের এক নিরাপত্তাকর্মীর কাছে চাঁদা দাবি করেন এই চক্রের সদস্যরা। চাঁদা না দিলে বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ডাকাতি করেন। এসব করতে গিয়ে কেউ গ্রেফতার হলে জামিনের ব্যবস্থা করেন নবী এবং আলমগীর।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক সূত্র বলছে, ২০০৭ সালে পুলিশের অভিযানের মুখে ২০টির বেশি মামলার আসামি নবী ও আলমগীর পালিয়ে যান।

পুলিশ জানায়, দুবাই পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান বাহিনীর দেশীয় অস্ত্রধারীরা রাজধানীর মতিঝিল এবং রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই তৎপর। জিসানের নামেই মহল্লায় মহল্লায় চলছে ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা। সম্প্রতি মতিঝিলে বহুল আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যাকাণ্ডে আলোচনায় এসেছে জিসান বাহিনীর নাম। এই মুহূর্তে রামপুরা এলাকায় জিসান গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন মিজান। একসময় তিনি জিসানের বাসার কেয়ারটেকার ছিলেন। তিনি কারও কাছে মামা মিজান, আবার কারও কাছে নেট মিজান হিসাবে পরিচিত। সুদের ব্যবসার আড়ালে প্রকাশ্যে চলছে সব অপকর্ম। সম্প্রতি তিনি জামিনে।

জিসানের ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজু। রামপুরার আইল্যান ফ্যাশন, কায়দার ফ্যাশন, মক্কা ফ্যাশন, শাহজাদা ফ্যাশন, সাইট জোন ফ্যাশন এবং আরমোর ফ্যাশনসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও টেম্পো স্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন জিসান বাহিনীর ক্যাডার আলামিন ওরফে পিচ্ছি আলামিন, মেহেদী হাসান ওরফে ভাতিজা হাসান এবং শামীমসহ বেশ কয়েকজন। আলামিনের নামে খিলগাঁও, রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় আছে ১০টি মামলা। মেহেদী হাসানের নামে ৫-৭টি মামলা আছে।

সম্প্রতি মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মোহাম্মদপুর জোনাল টিমের এসআই কমল বড়াল। এজাহারে তিনি উল্লেখ করে, ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার অনিচ উদ্দিনের নেতৃত্বে গত ৮ মার্চ মোহাম্মদপুর থানাধীন আসাদ গেট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলাম। এ সময় খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসডিপো সংলগ্ন যাত্রী ছাউনির সামনে গিয়ে ভারতীয় পিস্তলসহ নবী-আলমগীরের সহযোগী জহিরকে দৌড়ে গ্রেফতার করি। জহিরের বিরুদ্ধে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলানগর এবং মোহাম্মদপুর থানায় বেশ কয়েকটি মামলা আছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায় করা পেনাল কোডের তিনটি মামলা আদালতে বিচারাধীন। ডিবির এসআই সাইদুল ইসলাম বলেন, গত ২ এপ্রিল জানতে পারি, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মাদক ব্যবসায়ীরা অবস্থান করছে। পরে সেখানে গিয়ে সাইফুল ইসলাম এবং আব্দুর রহমানকে আটক করে দেহ তল্লাশি করে ৬০ গ্রাম মাদক পাওয়া য়ায়। দুজনই নবী এবং আলমগীরের হয়ে কাজ করে। তাদের কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই। তাদের নামে মাদারীপুরের শিবচর এবং রাজধানীর আদাবরসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা আছে।

নবী-আলমগীর বাহিনীর সদস্যরা গত বছর অক্টোবরে শ্যামলীর একটি মোটরসাইকেলের শোরুমে চাঁদা না পেয়ে দুজনকে কুপিয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেন। তখন ছয়জনকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। তিন মাস পর ছাড়া পেয়ে আবার চাঁদাবাজি শুরু করেন তারা।

বাড্ডা এলাকায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী বাহিনীর ক্যাডাররাও বেশ সক্রিয়। মধ্য বাড্ডার মেসার্স মহিমা এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মহিউদ্দিন মহির স্ত্রী উম্মে হাবিবা নয়ন যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মধ্য বাড্ডায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা অপসারণের কাজ করছেন। এ ব্যবসার জন্য আমাদের বেশকিছু কর্মচারী এবং ১০টি গাড়ি আছে। ৭০-৮০টি পরিবার এর ওপর নির্ভরশীল। আমেরিকায় পলাতক সন্ত্রাসী মেহেদীর লোকদের মাসে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করছিলাম। কারণ, ‘গুণ্ডা ভাতা’ ছাড়া আমাদের ব্যবসা করার সুযোগ ছিল না। প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৫০ হাজার করে টাকা দিচ্ছিলাম। মেহেদীর ক্যাডার হিসাবে রাজ এবং সায়েদ আমার কাছ থেকে এ টাকা নিচ্ছিল। এখন তারা আমার পুরো ব্যবসাই নিয়ে নিতে চাচ্ছেন। আমার ম্যানেজার ও কর্র্মচারীদের ভয় দেখিয়ে ইতোমধ্যে গাড়িগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছেন। গত দুই মাস ধরে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এ ছাড়া বাড্ডার ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসাসহ সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার অনিচ উদ্দিন জানান, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক একটি কানেকশন রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। আমরা তা বের করার চেষ্টা করছি। এ জন্যই আগে ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দেশীয় সহযোগীদের গ্রেফতারের উদ্যোগ নিয়েছি। বিস্তারিত জানার পর সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অভিযান শুরু করব।

যুগান্তর থেকে নেয়া। 

0 মন্তব্যসমূহ

-------- আমাদের সকল পোস্ট বা নিউজ বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা থেকে নেয়া - প্রতিটি পোস্টের ক্রেডিট সেই পোস্টের শেষ ভাগে দেয়া আছে।