ডলার নিজের কাছে না রেখে আজকেই বিক্রি করে দিন

US Dollars

অনেকেই একটু কমদামে ডলার কিনে সেটা জমিয়ে রেখেদেন একটু বেশি দামে বিক্রি করার জন্য তাদের জন্য খুবই বিপদ আসতে যাচ্ছে সামনের দিনে তাই বেশি লোকসান থেকে বাঁচার জন্য আজকেই বা ২/১ দিনের মধ্যে বিক্রি করেদিন আপনার সব ডলার। 

মনে রাখবেন এখন থেকে আর ডলারের দাম বৃদ্ধির কোনো চান্স নেই যা হবে শুধুই পতন। 

সাত দশকের বেশি সময় গেল আন্তর্জাতিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলার একচেটিয়া রাজত্ব করছে। জ্বালানি তেলের লেনদেনে ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে সেই একচেটিয়াত্ব সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠে। বহুকাল ডলার আর নিশ্চয়তা সমার্থক ছিল। এসবই বিভিন্ন দেশকে ডলারে রিজার্ভ রাখতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ডলারের এই অর্থনৈতিক আভিজাত্যের রাজনৈতিক ফল ভোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির শাসকেরা বহুবার এ সুবিধাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ভিন্নমতালম্বী রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে। এসব আক্রমণে বিভিন্ন সময় তারা সহযোগী করে নিয়েছিল ‘পাউন্ড’ ও ‘ইউরো’কে।
কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ডলারকে ক্রমাগত মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে অনেক দেশ এখন ত্যক্তবিরক্ত। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আফগানিস্তান থেকে রাশিয়া পর্যন্ত সবার ডলার-রিজার্ভ ইচ্ছেমতো আটকে দিচ্ছে, তাতে মধ্যপন্থী দেশগুলোর ভেতরও ভয় ঢুকেছে। গ্লাজিয়েভের ভাষায়, ডলার এখন এক বিষাক্ত মুদ্রার নাম। এ রকম ভীতিকে কাজে লাগিয়েই ডলার আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে চায় রাশিয়া।

এটা এখন পুরোনো খবর যে ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রিজার্ভ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের যোগাযোগব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে তাদের অনেক ব্যাংককে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। রাশিয়া এ মুহূর্তে ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনব্যবস্থা থেকে অনেকখানি বাইরে। এর আগে গত কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক এক বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়েছে।

সার্গেই গ্লাজিয়েভ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ রকম অর্থনৈতিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে এখনই দাঁড়ানো দরকার রাশিয়া, চীনসহ অন্যদের। এটাকে ‘শেষ বিশ্বযুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করে বইও লিখেছেন তিনি ২০১৬ সালে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পাল্টা হিসেবে রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের একটা বড় প্রকল্প হলো ইউরেশিয়া ইউনিয়ন। বর্তমানে এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন সার্গেই গ্লাজিয়েভ। ইউরেশিয়া ও চীনকে কাছাকাছি এনে এই পণ্ডিত দল বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারবিরোধী নতুন মুক্তাঞ্চল গড়তে চায়। পুতিনের এই পরামর্শকদের পরিকল্পনা হলো ডলার আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইউক্রেন যুদ্ধটা আরও বড় পরিসরে করা যায়। তাঁরা মনে করছেন, ঔপনিবেশিক মুরব্বি হিসেবে ব্রিটিশদের আধিপত্য খর্ব হওয়ার সময় গত শতাব্দির মাঝামাঝি বিশ্ব যেভাবে বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেয়েছিল, সে রকম আরেক মুহূর্ত এসেছে এখন। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমবে এবং তা কমানোর সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। কেবল সার্গেই গ্লাজিয়েভ বা পুতিন নয়, চীন-ভারতও নতুন সেই চিন্তায় শামিল হতে আগ্রহী।

কিন্তু নতুন এ যুদ্ধের দামামায় এ–ও সবার মনে আছে, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং লিবিয়ার গাদ্দাফি ডলারের আধিপত্য ভাঙতে গিয়ে শহীদ হন বলে কথিত আছে। সেই বিবেচনায় সার্গেই গ্লাজিয়েভ পুতিনের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের বড় এক প্রতিপক্ষ এখন। অথচ এই পুতিনই ক্ষমতার প্রাথমিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বেশ পছন্দের শাসক ছিলেন।

ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত না হলেও প্রথম থেকে এ যুদ্ধে তাদের প্রথম লক্ষ্য রুবলকে ঘায়েল করা। এখন মনে হচ্ছে সেটা আপাতত ঘটছে না। বরং রুবলের চাহিদা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়াবিরোধী অনেক দেশে রুশ পণ্য ও সেবার জায়গায় ওয়াশিংটন তার পণ্য ও সেবার প্রবেশ বাড়াতে পেরেছে এ মুহূর্তে। কিন্তু এর মাঝেও ওয়াশিংটনের জন্য হতাশার একটা দিক হলো চীন ও রাশিয়া নিজেদের মাঝে সুইফটের বাইরে অর্থনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান করতে থাকায় তাদের বাণিজ্য-তথ্যে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নজরদারি করতে পারছে না। ডলার আধিপত্য না থাকার আরেক পরোক্ষ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্তৃত্বও কিছুটা খর্ব হওয়া। আইএমএফকে ব্যবহার করে দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে যেভাবে তার পছন্দের অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণে বাধ্য করেছে, সেটা আগামী দিনে আর সহজে না–ও হতে পারে।

এসবই হলো বিশ্বকূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার আগ্রাসী অবস্থানের বড় এক পটভূমি। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনকে মাঝখানে রেখে বিশ্বকে দুভাগ করতে চাইছে ওয়াশিংটন। এই ভাগাভাগির কেন্দ্রে তাদের বড় লক্ষ্য অবশ্যই ডলারের একচেটিয়াত্ব ধরে রাখা। যেসব দেশ রাশিয়া, চীন, ইরান বা ভেনিজুয়েলার সঙ্গে নিজ মুদ্রায় লেনদেন করতে চাইছে বা চাইবে, তারা নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক কূটনীতিক চাপের শিকার হবে এ সময়। সেই চাপ কখনো আসবে মানবাধিকার পরিস্থিতির আদলে, কখনো রাজনৈতিক গণতন্ত্রের আকুতির আড়ালে। যদিও এ দুটোও জরুরি।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শুরু হওয়া নব পর্যায়ের এ টানাপোড়েন ইউক্রেন যুদ্ধকেও দীর্ঘায়িত করবে। এ যুদ্ধের ফলাফলে এখন আর কেবল ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নয়—বৈশ্বিক পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তারও নিষ্পত্তি নির্ভর করছে। অনেকে মনে করছেন, এ যুদ্ধের ফয়সালা হবে সমরবিদদের হাতে নয়, অর্থনীতিবিদদের দ্বারা। কিয়েভকে ঘিরে চলতে থাকা ধ্বংসলীলা বন্ধ হলেও এ যুদ্ধের আড়ালে শুরু হওয়া বিকল্প মুদ্রাব্যবস্থা গড়ার মূল যুদ্ধ থামবে না। সার্গেই গ্লাজিয়েভ ও আলেক্সান্ডার দাগিনরা এ যুদ্ধকে ওদিকেই নিতে চেয়েছিলেন (এবং ওয়াশিংটনও তাতে শামিল হয়েছে সব শক্তিতে!)

Advertisement