বিদেশি অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে আগ্রহী নয় সরকার!

বিদেশি অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে আগ্রহী নয় সরকার!

সম্ভাবতা যাচাইয়ের নামে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচের পর স্বপ্নের বুলেট ট্রেন প্রকল্প থেকে সরে এলো বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেল সেবার মানোন্নয়নে ২০১৭ সালে বুলেট ট্রেন চালুর প্রকল্প হাতে নেয় রেল কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্যেই ব্যয়বহুল এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চীনা দুটি কোম্পানির সঙ্গে শুরু হয় আলোচনা। তাতে সাড়াও মিলেছিল। কিন্তু ঋণ পরিশোধে কঠিন শর্ত ও রেল পরিষেবা দীর্ঘদিন চীনা কোম্পানির হাতে রাখার কৌশলে বেঁকে বসে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে আপাতত বুলেট ট্রেন প্রকল্প থেকে সরে আসতে হয়েছে রেলওয়েকে।

আগামীতে সহজ ও গ্রহণযোগ্য শর্তে বড় কোনো দাতা সংস্থার অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আপাতত বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্পে আগ্রহী নয় সরকার। আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়েই সরকার এই পথে হাঁটছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হলে এ প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান। যারা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয় জিটুজি ও পিপিপির মাধ্যমে। প্রস্তাব অনুযায়ী, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসিসি) ও চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) যৌথভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে রেলপথটি নির্মাণ করবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ঋণের সংস্থান ও রেলপথটি নির্মাণের দায়িত্ব নেবে প্রস্তাবিত কোম্পানি। ঋণ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রায় এক লাখ কোটি টাকার এ ঋণ ২০ বছরে পরিশোধের শর্ত দেয় তারা। প্রতি বছর দুটি করে মোট ৪০টি কিস্তিতে ঋণ শোধ করতে হবে। ঋণের জামিনদার হবে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, রেলপথটি নির্মাণের জন্য গঠিত কোম্পানির সঙ্গে সিআরসিসি ও সিসিইসিসির একটি চুক্তি হবে। এ চুক্তির মাধ্যমে কেবল তারাই রেলপথটির নির্মাণকাজে অংশ নিতে পারবে। রেলপথটি নির্মাণের পর ন্যূনতম পাঁচ বছর বা ঋণ পরিশোধের শর্তে অতিরিক্ত কয়েক বছর রেলপথটি পরিচালনার পর তা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হবে।

অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার মধ্যেই হাইস্পিড রেলপথের সম্ভাবতা সমীক্ষার জন্য ২০১৭ সালে চাইনিজ কোম্পানির সঙ্গে দেশীয় মজুমদার এন্টারপ্রাইজকে দায়িত্ব দেয় রেলওয়ে। তখন কথা ছিল, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সমীক্ষা করা হবে। কিন্তু চট্টগ্রাম পর্যন্ত সমীক্ষা করেই কাজ শেষ করে কোম্পানি দুটি। এতে খরচ

হয় ১০০ কোটি টাকা। যার পুরোটাই ছিল সরকারি অর্থায়ন। কিন্তু সহজ শর্তে হাইস্পিড বা বুলেট ট্রেনের জন্য চীন ছাড়া বিদেশি কোনো বড় দাতা সংস্থা এগিয়ে না আসায় প্রকল্পটি আপাতত শুরুর পক্ষে নয় পরিকল্পনা কমিশন। যার পরিপ্রেক্ষিতে রেল মন্ত্রণালয় ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন রবিবার ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা আমাদের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টার প্লানের মধ্যে এটা (বুলেট ট্রেন) রাখিনি। তবে এ প্রকল্পের সম্ভাবতা যাচাইয়ের কাজটি শেষ করেছি। এ কাজে নিযুক্ত প্রতিষ্ঠান দুটি প্রকল্পের ডিপিপি, টেন্ডার ডকুমেন্ট, ডিটেইল ডিজাইন ও বাজেট প্রস্তুত করে দিয়েছে। তবে আমরা এ প্রকল্পটি নিয়ে একটু ধীরে চলছি। কেননা, আমরা মনে করি, এ প্রকল্পে যে অর্থ খরচ হবে তা দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন, ঢাকা-কক্সবাজার রেল প্রকল্পসহ বহু জরুরি প্রকল্প শেষ করা যাবে।

রেলমন্ত্রী আরো বলেন, আমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসার আগেই হাইস্পিড ট্রেন প্রকল্পের সম্ভাবতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু আমাদের বিদ্যমান অবকাঠামো হাইস্পিড ট্রেনের উপযোগী নয়। অন্যদিকে আমাদের যেসব প্রকল্প আগে শেষ করা দরকার, যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইনই আমরা শেষ করতে পারিনি। তাছাড়া দোহাজারী-কক্সবাজার, পদ্মা লিংক রেল প্রকল্প, খুলনা-মোংলা, ঢাকা-জয়দেবপুর-টঙ্গী চার লেনসহ অনেক প্রকল্প রয়েছে যেগুলো জরুরি। তাছাড়া এখনো দেশে কোনো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু নেই, অথচ হাইস্পিড ট্রেন চলবে পুরোপুরি বিদ্যুতে। সে কারণে আমরা আগে এ ধরনের হাইস্পিড ট্রেনের জন্য অবকাঠামো তৈরি করব, তারপর এ প্রকল্প নিয়ে ভাববো।

চীনা কোম্পানি ও দূতাবাসের সঙ্গে ইতিমধ্যে চিঠি চালাচালির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, চীন এ প্রকল্পের বিষয়ে তাদের আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে যখন আমরা বিষয়টি চূড়ান্ত করব তখন দেখবো কারা কারা কাজ করতে চায় তাদের শর্তই বা কি, যারা সহজ শর্তে অর্থায়নে রাজি হবেন তাদের দিয়ে কাজ হবে। তবে আপাতত আমরা হাইস্পিড ট্রেন প্রকল্পটি থেকে সরে এসেছি। এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়, তাছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ও রয়েছে, বিষয়টি তারা দেখছেন।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, এর আগে কোরিয়ান দুই কোম্পানি হাইস্পিড রেল নির্মাণের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু সে প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি রেলওয়ে। কারণ তারা ইতোমধ্যে ১০টি রেলইঞ্জিন চুক্তিতে শর্ত ভঙ্গ করেছে।

এদিকে সম্ভাবতা যাচাইকারী চীনা কোম্পানির সহযোগী মজুমদার এন্টারপ্রাইজ সূত্রে জানা যায়, সম্ভাবতা যাচাই করে তারা তা রেল মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। তবে সেখানে সহজ শর্তের ঋণে এ প্রকল্পটির কাজ করতে সুপারিশ করা হয়।

রেলপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দূরত্ব ৩২০ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার। তবে হাইস্পিড ট্রেন বাস্তবায়িত হলে ১০০ কিমির মতো পথ কমবে। এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলার (প্রায় এক লাখ কোটি টাকা)। সমীক্ষা অনুযায়ী, হাইস্পিড রেলপথটি নির্মাণ করা হবে

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম রুটে। রুটটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৭ কিলোমিটার। রেলপথটি হবে শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য। ডিজাইন স্পিড ধরা হয়েছে প্রতি ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার। স্ট্যান্ডার্ড গেজের দুটি লাইন নির্মাণ করা হবে, যেগুলোর এক্সেল লোড হবে ১৭ টন ধারণক্ষমতার। বিদ্যুৎচালিত রেলপথটি হবে পাথরবিহীন। ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক ‘অটোমেটিক ব্লক’ সিগন্যাল ব্যবস্থা। রেলপথটিতে একটি ট্রেন বিরতিহীনভাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে সময় নেবে ৫৫ মিনিট। আর বিরতি দিয়ে চললে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে সময় লাগবে ৭৩ মিনিট।

এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. অধ্যাপক শামসুল হক বলছেন, আমাদের উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন তেমনি বর্তমান যে রেল ব্যবস্থা চালু রয়েছে সেগুলোকে সঠিকভাবে দেখভাল করাও দরকার। বুলেট ট্রেনের জন্য যে প্লে­গ্রাউন্ড দরকার তা এখনো বাংলাদেশ হতে পারেনি। এছাড়া বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি বলেন, অনেক সময় সুবিধা নিতে বা প্রজেক্ট চাপিয়ে দেয়ার জন্য পেছনের দরজা দিয়ে কিছু প্রজেক্ট নিয়ে আসেন অনেকে। এটার বেলায়ও কোনো কিছু বিবেচনা না করে সম্ভাবতা যাচাইয়ের নামেই ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেল। এ অর্থ দিয়ে রেলের বর্তমান বেহাল দশার কিছুটা অন্তত ঠিক করা সম্ভব ছিল।

0 মন্তব্যসমূহ