৩ কোটি বইয়ের ঘাটতি

৩ কোটি বইয়ের ঘাটতি নিয়ে বছর শুরু

অতিমারি করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবার পাঠ্যপুস্তক উৎসব নেই। তবে সাড়ে ৩ কোটি মুদ্রণ বাকি রেখেই আজ শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে এবার তেরো দিনব্যাপী চলবে এই কার্যক্রম। সেই হিসাবে ১৩ জানুয়ারি নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শেষ বই বিতরণ।ইতোমধ্যে বৃহস্পতিবার পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল।

এদিকে শিশুরা নতুন বই পেলেও আরও অন্তত ৩ মাস পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। করোনা সংক্রমণ থেকে শিশুদের রক্ষার্থে এই সিদ্ধান্ত বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

নতুন বছরের ক্লাস ও পাঠ পরিকল্পনা বৃহস্পতিবার রাতেই প্রকাশ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও (ডিপিই) দু-একদিনের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের সিদ্ধান্ত জানাবে। উভয় স্তরই প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত আগের মতো আংশিক শ্রেণি কার্যক্রম চালাবে। তবে পঞ্চম, দশম এবং এসএসসি-দাখিল পরীক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পাবে। তাদেরকে সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে।

সরকার এবার প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৩৫ কোটি বই মুদ্রণ করছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৪টি আর মাধ্যমিকে ২৪ কোটি ৭১ লাখ ৬৩ হাজার ২৫৬টি বই আছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত প্রাথমিকে ৯ কোটি ২৭ লাখ ৬২ হাজার ২৩২ এবং মাধ্যমিকে ২১ কোটি ৯২ লাখ ২০ হাজার ৫৫৫টি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এই হিসাবে প্রাথমিকে ৭০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৪২ এবং মাধ্যমিকে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৪২ হাজার ৭০১টি সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘কিছু বই সরবরাহ বাকি আছে। তবে ২ জানুয়ারির মধ্যে সবই সরবরাহের লক্ষ্য আমরা নির্ধারণ করেছি। আইন অনুযায়ী, মুদ্রণকারীরা মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহে সময় পান। কিন্তু সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসাবে তারা এবার বেশ সহযোগিতা করেছে। তাদের সহযোগিতায় বাকি কাজটুকুও লক্ষ্যমতো শেষ হবে বলে আশা করছি।’এই কর্মকর্তারা জানান, মোট ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৩০টির মধ্যে ৩১ কোটি ১৯ লাখ ৮২ হাজার ৭৮৭টি বই পৌঁছে গেছে। বই গ্রহণ করে সফটওয়্যারে যে তথ্য মাঠের শিক্ষা কর্মকর্তারা আপলোড করেন সেই তথ্য এটা।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে এত বই যায়নি। ৩১ কোটির মধ্যে অন্তত ১ কোটি বই এখনো ট্রাকে পথে আছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বই বিতরণ করা হচ্ছে। আর বই ছাপায় বেহাল দশার কারণেই করোনার দোহাই দিয়ে এবার ১৩ দিন ধরে বই বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মূলত বই মুদ্রণ শেষ করতে এবার গোটা জানুয়ারি মাস লেগে যেতে পারে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীরা সব বই একসঙ্গে নাও পেতে পারে।

মাঠপর্যায়ে বই বিতরণের দায়িত্ব মাউশির। এ ব্যাপারে সংস্থাটির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ গোলাম ফারুক যুগান্তরকে বলেন, যদি সব বই না যায় তাহলে ধাপে ধাপে দেওয়া হবে। এটা বড় কোনো সমস্যা নয়। কেননা, জানুয়ারিতে ক্লাস কম হয়। তাছাড়া করোনাকালীন ব্যবস্থা অনুযায়ী নতুন পাঠ পরিকল্পনায় যেসব ক্লাস নির্ধারিত আছে তাতে সব বই একসঙ্গে হাতে না পেলে সংকট হবে না।সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক স্তরে এবার বই মুদ্রণ কার্যক্রম শুরু হয় বেশ আগেই। যে কারণে এই খাতের মাত্র ৭১ লাখ বই সরবরাহ বাকি আছে।

ডিপিই মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম যুগান্তরকে জানান, এবার ১ শতাংশ বই বাফার স্টকের জন্য ছাপানো হয়েছে। এই হিসাবে কিছু বই আমরা বিতরণ করব না। এরপর খুব অল্প সংখ্যকই বাকি থাকবে। গত বছরের মতো আমরা এবারও ক্লাস ধরে ধাপে ধাপে বিতরণ করছি। অবশিষ্ট বই দু-একদিনের মধ্যে মাঠপর্যায়ে চলে যাবে। তাই কোনো সংকট হবে না।

তিনি আরও বলেন, এবারে বরং অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি সংখ্যক বই স্কুলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর কৃতিত্ব শিক্ষা কর্মকর্তাদের। তারা রাত জেগে প্রেসে গিয়ে তদারকি করেছেন। এ তদারকির কারণে বইয়ের কাগজ, ছাপার মান ও বাঁধাই তিনটিই অনেক ভালো হয়েছে। শিশুরা উন্নতমানের বই পাচ্ছে।

এবার মাধ্যমিক স্তরের বই মুদ্রণে দুভাগে দরপত্র দেওয়া হয়। প্রথম ভাগে অষ্টম-নবম আর ইবতেদায়ির তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপানো চুক্তি শেষ হয় গত ৮ নভেম্বর। এই দরপত্রে মুদ্রাকরদের ৮৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের সময় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এতে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের শর্ত দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী, মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি এবং ইবতেদায়ির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বই সরবরাহে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় পাচ্ছেন মুদ্রাকররা। এই দরপত্রে বই সরবরাহে সময় দেওয়া হয় ৭০ দিন। সেই হিসাবে ১৭ ডিসেম্বরের অর্ধেক বই সরবরাহের শর্ত দেওয়া হয়। জানা গেছে, দ্বিতীয় দরপত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ বই মুদ্রাকররা সরবরাহ করেছেন। আর প্রথম দরপত্রের বই সরবরাহ হয়েছে ৬৫ শতাংশের মতো।

একটি সূত্র জানিয়েছে, মুদ্রাকরদের একটি অংশ ইচ্ছা করে বই মুদ্রণে বিলম্ব করেন। এর কারণ হচ্ছে, যখন ১ জানুয়ারি চলে আসে, তখন এনসিটিবি বইয়ের মানের চেয়ে সরবরাহের দিকে বেশি তাকান। ফলে নিুমানের কাগজে বই সরবরাহের পথ সুগম হয়। সাড়ে ৩ কোটি বই সরবরাহে বিলম্বে এটাও একটি কারণ বলে ওই কর্মকর্তা জানান।

নতুন পাঠ পরিকল্পনা : নতুন বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য নতুন পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনুসরণের জন্য কোন ধরনের রুটিন অনুসরণ করতে হবে তা বৃহস্পতিবার রাতেই মাউশির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত অফিস আদেশে বলা হয়, ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সপ্তাহে প্রতিদিন ৪টি বিষয়ের ওপর ক্লাস নেওয়া হবে। ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে প্রতিদিন (বিদ্যালয় খোলা থাকা সাপেক্ষে) ক্লাস হবে এবং দিনে ৩টি বিষয়ের ক্লাস নেওয়া হবে। ৮ম ও ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সপ্তাহে দুদিন ৩টি করে বিষয়ের এবং ষষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সপ্তাহে একদিন ৩টি বিষয়ের ক্লাস নেওয়া হবে। পৃথক আরেক চিঠিতে ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদেরও সপ্তাহে ৪ দিন ক্লাস নিতে রুটিন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।মাউশি মহাপরিচালক বলেন, আপাতত পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই রুটিন চলবে। পরে অবস্থা অনুযায়ী ক্লাস সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো হবে।

অন্যদিকে দু-একদিনের মধ্যে প্রাথমিকের রুটিনও প্রকাশ করা হবে বলে জানান ডিপিই মহাপরিচালক। তিনি বলেন, দুই ধরনের রুটিন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে জরুরি পরিস্থিতি উদ্ভব হলে কেমন করে পাঠ কার্যক্রম চালানো হবে। আরেকটি হচ্ছে, এখন যেভাবে চলছে সেটা চালিয়ে নেওয়া। পরিকল্পনায় আপাতত গত সেপ্টেম্বর থেকে অনুসৃত নীতিই অনুসরণ করা হবে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদেরও সপ্তাহে একদিন স্কুলে আনা যায় কি না তা ভাবা হচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ