ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না


দৃশ্যত ধার্মিক। অফিসে টেবিলের ড্রয়ারে সবসময় থাকে টাকার বান্ডিল। সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, অথচ ঘুষ ছাড়া ফাইল এক চুলও নড়তে দেন না। হাতে টাকার বান্ডিল তুলে না দিলে তার টেবিল থেকে ফাইল নড়ে না। টাকার বান্ডিল ড্রয়ারে পড়লেই ফাইল নড়েচড়ে উঠে। তিনি আবার টাকা কম নেন না, চালু করেছেন ‘প্যাকেজ রেট’। এই নারী কর্মকর্তা এতই প্রভাবশালী যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সব কর্মকর্তা কর্মচারী তাকে এক নামে চেনেন। কেউ তাকে ঘাটাতে যান না। ফলে যারা রাজধানী ঢাকায় জমিজমার মালিক ও ঘরবাড়ি করেন; তারা যেন ওই নারী কর্মকর্তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তার নাম রাহেলা রহমত উল্লাহ। রাজউকের উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১)।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সেবামূলক কার্যক্রম নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। সরকারি এই সংস্থাটির বিভিন্ন পদে নানা সময় অদলবদল ঘটেছে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ অপরিবর্তিত শুধু নয়, পর্যায়ক্রমে ব্যাপকতাও লাভ করেছে। শুধু রাজউক বলেই নয়, দেশের যেসব সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষ যত বেশি নির্ভরশীল, অনিয়ম-দুর্নীতি সেখানে তত বেশি। রাজউকে এখনো ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। ঘুষের টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল পড়ে থাকে বিভিন্ন টেবিলে। ঘুষের টাকার জন্য জমি বা ফ্ল্যাট মালিকদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছেন।

রাজউকে ‘ঘুষ বাণিজ্য’ নিয়ে কর্মচারী ও দালালদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। রাজউক ভবনের পাশের গলিতে সকাল ৯টার আগ থেকেই লোকজনের আনাগোনা শুরু। আশপাশের ছোট ছোট দোকানগুলোতে বেচাকেনাও জমজমাট। আগন্তুকদের বেশির ভাগই জমির দালাল, হাউজিং ব্যবসার এজেন্ট এবং সাধারণ সেবাপ্রার্থী। ফাঁকে ফাঁকে রাজউকের দু’চারজন কর্মচারীও আসছেন। চা অথবা সিগারেট খাওয়ার ফাঁকে ‘সিক্রেট’ আলাপও সেরে নিচ্ছেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই টাকা-পয়সা লেনদেনের কথাবার্তা কানে আসে।

বাড়ির নামজারি, প্লট বরাদ্দ, প্লট হস্তান্তর, ফ্ল্যাটের চাবি হস্তান্তর, প্লটের মালিকের নথিভুক্তি ইত্যাদি বিভিন্ন পরিষেবা দেয়ার ক্ষেত্রে সেবার ধরণ ভেদে দুই হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ম-বহির্ভুত অর্থ লেনদেন হয়। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ না দিলে অহেতুক সময়ক্ষেপন করে গ্রাহককে হয়রানি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে সেবা গ্রহীতাদের প্রতারণা ও হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক যুগ্মসচিব, রাজউকের কর্মকর্তা বর্তমানে সেবাগৃহীতা বলেন, আমিও বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি। এমন ঘুষখোর মহিলাকে দেখিনি। সে একজন সিনিয়র সহকারী সচিব পদের কর্মকর্তা তার মুখের ভাষা এমন দেখিনি। টাকা না দিলে সে মানুষের সাথে এমন আচারণ করে।

এদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান নতুন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী রাজউকে যোগদান করার পর রাজউকে কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে দুর্নীতি অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী ইনকিলাবকে বলেন, উপ-পরিচালক রাহেলা রহমত উল্লাহ’র বিরুদ্ধে সেবগ্রহীতা অনেকেই বিভিন্ন অভিযোগ করছেন। আমি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। যে কোনো সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবশ্য এ বিষয়ে রাজউকের উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) রাহেলা রহমত উল্লাহ ইনকিলাবকে বলেন, আমি কোনো মানুষকে হযরানি করছি না। আমার টেবিলে ফাইল পড়ে থাকে না।

We Gamers Club

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবির) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজউক ও দুর্নীতি সমার্থক, তেমনটা আরো অনেক সরকারি খাতের সেবাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কমবেশি সত্য। ভবন নির্মাণের মতো আরো বহু নির্মাণ রয়েছে, যা শুরু করতে অনুমোদন লাগে। আর এই অনুমোদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হয়। রাজউকের ঘুষের অঙ্ক কোটি টাকা পর্যন্ত ওঠার ধারণা অসংগত মনে হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।

রাজউকের দেয়ালে দেয়ালে সাবধান বাণী। দুর্নীতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দুর্নীতি করব না, দুর্নীতি সইব না। আরো কত কী নীতিকথা! কিন্তু কে শোনে কার কথা। প্রবাদে রয়েছে ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’। বাস্তবতা হলো রাজউকে ঘুষের লেনদেন ছায়াসঙ্গির মতো। আরো সহজ করে বললে বলতে হবে ‘ঘুষের ওপেন হাট’। এর ফলে রাজউকে ঘুষ ছাড়া ফাইল রিলিজ করা কঠিন।

গত কয়েক দিন ধরে রাজউকের বিভিন্ন শাখায় ঘুরে অবিশ্বাস্য চিত্র চোখে পড়ে। সকাল থেকেই এনেক্স ভবনের এস্টেট ও ভ‚মি-১ শাখার প্রায় সব কর্মকর্তাকে মহাব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কারো যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। সবাই কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং সই-স্বাক্ষরে ব্যস্ত। আবার টেবিলে টেবিলে নিচু স্বরে কথাবার্তাও হচ্ছে। পরিবেশ অনেকটা মেলার হৈহুল্লোড়ের মতো।

উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভ‚মি-১) রাহেলা রহমত উল্লাহর কক্ষের সামনে একটু পরপরই দর্শনার্থী আসছেন। কিন্তু তার দরজা বন্ধ থাকে সব সময়। অথচ বড় বড় কর্মকর্তাদের দরজা খোলা থাকে সাধারণ মানুষের সেবা দেয়ার জন্য। বেশিরভাগ সময় উপ-পরিচালক অনুপস্থিত থাকেন। কেউ কথা বললে জানানো হয়, তিনি সচিবালয়ে গেছেন।

ফলে কক্ষটি বন্ধ। তাকে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সেবা প্রার্থীরা। একজন সিনিয়র সহকারী সচিব রাহেলা রহমত উল্লাহ এর আগে শরিয়তপুর ২০১৭ সাল থেকে ২০১৮ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে বদলি নিয়ে মানিকগঞ্জে সিঙ্গাইর উপজেলায় যান। সেখান থেকে বদলি হয়ে রাজউকে আসেন। রাজউকের উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভ‚মি-১) রাহেলা রহমত উল্লাহ ঘুষ আদায়ের বহু পুরনো পদ্ধতি বাতিল করে নতুন পদ্ধতি প্যাকেজ রেট চালু করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, ‘ঘুষ প্যাকেজে’ সব কর্মকর্তার ভাগ থাকে। এমনকি যে পিওন ফাইল টেনে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে নিয়ে যায় তিনিও সেখান থেকে কিছু টাকা পান। কাউকে বঞ্চিত করা হয় না। কিন্তু ঘুষ না পেলে ফাইল নড়ে না। প্যাকেটের টাকা না দিলেই নানা আইনের মারপ্যাঁচ আসে। ফাইল টেবিলে চাপা পড়ে থাকে বছরের পর বছর।

রাজউকে চেহারা ও চালচলন দেখে ঘুষখোর চেনা যাবে না। বড় ঘুষখোরদের আচরণ অনেকটা শেয়াল পন্ডিতের মতো। ওপরে তারা শতভাগ সৎ। আজানের ধ্বনি শুনেই তারা নামাজ আদায় করতে যান। কিন্তু দিনশেষে তাদের বড় ভাগের টাকা ঠিকই জায়গামতো পৌঁছে যায়।

টিআইবির গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়, রাজউকের ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদনে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। যেমন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজউক কর্মকর্তা, দালাল ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের মাধ্যমে চুক্তি করে সুনির্দিষ্ট হারে নিয়ম বহিভর্‚ত অর্থ নেয়া হয়। জরিপের সময়ও চুক্তিভিত্তিক নিয়ম বহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ব্যক্তি ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে এর পরিমাণ দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছাড়পত্র অনুমোদনে ব্যক্তি পর্যায়ে ১৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে এক লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।

 সেবা গ্রহীতারা ইমারত নকশা অনুমোদনের সেবা গ্রহণেও নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন। ব্যক্তি পর্যায়ে দশ তলা পর্যন্ত ইমারতের নকশা অনুমোদনে ফি-এর অতিরিক্ত ৫০ হাজার থেকে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে দুই লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। আবার দশ তলার ঊর্ধ্বের ইমারতের নকশা অনুমোদনে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে ফি-এর অতিরিক্ত ১৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বৃহদায়তন বা বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পরিমাণ ১৫ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত। নাগরিক সনদ ও বিধিমালা অনুয়ায়ী নকশা অনুমোদনের নির্ধারিত সময় যথাক্রম ২০ দিন ও ৪৫ দিন হলেও সে অনুযায়ী অনুমোদন না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণত চার মাসে নকশা অনুমোদন হয়ে থাকে। সময় মতো ঘুষ না দেয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে, অর্থের পরিমাণ বেশি হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কাজ সম্পন্ন হয়।

রাজউকে সরেজমিন অবস্থানের সময় বেশ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামের তালিকা পাওয়া যায়। এদের অন্যতম হলেন জনৈক কর্মচারী রেজাউল। ছোট্ট চাকরি করেও তিনি নাকি শত কোটি টাকার মালিক। রেজাউল সরকারি চাকরি করেন বলে স্ত্রীকে ব্যবসায়ী সাজিয়েছেন। রাজউকের আর এক কর্মচারী ওবায়দুল্লাহর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম মোহাম্মদ এন্টারপ্রাইজ। অফিস নিয়েছেন রাজউক ভবনের পেছনে ৬০ এমএনএসএন টাওয়ারের ৮ম তলায়। ভবনের আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, ৮০৬ নম্বর কক্ষে ওবায়দুল্লাহার স্ত্রীর মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় আছে। দিনের বেশিরভাগ সময় এখানেই থাকেন তিনি।

ওবায়দুল্লাহর ভায়েরা ভাই আব্দুল জলিল রাজউক সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক। গোল্ডেন মনিরের মামলায় দুদকে অনুসন্ধান জালে তিনি আটকা পড়েছেন। রাজউকের নিম্নমান হিসাব সহকারী ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। ফাইল গায়েব কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে কিছুদিন বরখাস্ত ছিলেন তিনি।

রাজধানীর মহাখালী থেকে আসা মহিউদ্দিন নামের একজন সেবাগ্রহীতা ইনকিলাবকে বলেন, প্রতিবছর নামজারি করতে আসি আমি। আগে সামান্য কিছু খরচ দিলে কাজ করে দেয়া হতো। এখন আর সেটা হচ্ছে না। আগেই প্যাকেজ আকারে টাকা চুক্তি করতে হচ্ছে। নামজারি করার আগে প্যাকেজ টাকা না দিলে কাজ হবে না। দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। আমি ৬ মাস ধরে ঘুরছি। এ মহিলার কথা বার্তা ও আচারণ ভালো নয়।

গুলশান থেকে আসা সাজ্জাদ হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, এমন মহিলা অফিসার দেখিনি। তার কাছে কোনো মানুষ কথা বলতে পারেন না। তিনি সব সময় রাজউকের চেয়ারম্যানের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেখান। টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। কোনো একজন কর্মকর্তার কাছে ঘুষের পুরো টাকা তুলে দিতে পারলেই বাজিমাত! সব কাজ হয়ে যায় বিদ্যুৎ গতিতে।

সূত্র - দৈনিক ইনকিলাব 

Advertisement