দুর্নীতিমুক্ত দেশ দেখে যেতে চান বীর মুক্তিযোদ্ধারা

দুর্নীতিমুক্ত দেশ দেখে যেতে চান বীর মুক্তিযোদ্ধারা

বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের ৫০ বছর। যুদ্ধ করে যারা এ দেশের স্বাধীনতা এনেছেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই কালের নিয়মে চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। একাত্তরে যাদের বয়স ছিল ১৫ থেকে ২০ কিংবা ২৫ এর কোটায়। আজ তারা ৭০ পেরিয়েছেন। বেঁচে আছেন অনেকেই। তাদেরও একে একে চলে যাওয়ার পালা। জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা আজ উদযাপন করবেন বিজয়ের ৫০ বছর। দীর্ঘ এই পথচলায় তারা দেখেছেন দেশটির নানা চড়াই-উতরাই এবং উন্নয়ন।

এতে তাদের মনে যেমন প্রশান্তি রয়েছে। তেমনি আছে শঙ্কাও। আর এই শঙ্কার অন্যতম প্রধান কারণ দুর্নীতি। যা স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করছেন তারা। দুর্নীতি দূর করতে না পারলে, তাদের ত্যাগ ও কষ্ট যেমন বৃথা হবে তেমনি দেশের অগ্রযাত্রাও ব্যাহত হবে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান তাদের। তাদের মতে, দেশ এগিয়ে গেলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত খুব একটা হচ্ছে না। সেদিকেও নজর দেয়া জরুরি।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী। ২১ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে তার বয়স ৭১ বছর। তার ভাষায়, একাত্তরে সবেমাত্র নতুন বিয়ে করেছি। রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুনে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভারতের কুচবিহারের মেটলিতে মুজিব ক্যাম্পে শেখ কামালের সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছি। বিজয়ের ৫০ বছরের অনুভূতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন দেখে যেতে পারছি, এটা আমার জন্য অনেক গর্বের, ভালো লাগার। প্রিয় বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন-অগ্রগতি দেখে ধন্য মনে করছি এই কারণে যে, স্বাধীনতার সুফল জাতি পেতে শুরু করেছে। এখন নতুন প্রজন্মের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানুন। আগামী প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে। আমরা ত্যাগ স্বীকার করেছি। যুদ্ধ করেছি। এখন উন্নয়ন হচ্ছে। এই উন্নয়ন ধরে রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের।

যুদ্ধের সময় তার বেদনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, একটা পর্যায়ে মাত্র ১০ গজের মধ্যে হানাদার বাহিনী আমাকে ঘিরে ধরেছিল। আমার বামপাশের বাংকারে যিনি ছিলেন তাকে বেয়নেটের খোঁচার আঘাতে জীবন দিতে হয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, শত্রুদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারিনি। যা আজো আমাকে তাড়িত করে। তবে ভালোলাগার বিষয় হলো, আজকে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সুফল ভোগ করছে। এটা দেখে যেতে পারছি।

একাত্তরে ২০ বছর বয়স ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেবের। ছাত্রাবস্থায় ঢাকাতেই থাকতেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ স্বশরীরে উপস্থিত থেকে দেখা ও শোনার সুযোগ হয়েছে তার। ভাষণ শুনেই তার মধ্যে জাগ্রত হয় সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া এদেশ স্বাধীন হবে না। তিনি চলে যান নিজ এলাকা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। যুবক-তরুণদের সংগঠিত করে ৩২ জনকে নিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় ট্রেনিং নিতে যান। বর্তমানে তার বয়স ৭০ বছর।

নিজের অনুভ‚তির কথা জানিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সুবর্ণজয়ন্তীতে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে উৎফুল্লিত ও গর্বিত মনে করছি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। যদিও এখনো অনেক উন্নয়ন বাকি রয়েছে। তবে এই উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। যা সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান। রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসন সর্বত্রই বিরাজমান এই দুর্নীতি। যার জন্য অনেক বড় বড় অর্জন ও ভালো উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। এটা দুঃখজনক। আমরা দুর্নীতিমুক্ত দেশ দেখতে চাই। চাই, সবাই দেশকে ভালোবাসবে। দেশের মানুষকে ভালোবাসবে। সাধারণ মানুষ যেন উপকৃত হয়, সেজন্য কাজ করবে। কিন্তু আমরা জায়গায় জায়গায় হোঁচট খাচ্ছি এই দুর্নীতির জন্য। যা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে অপমানিত বোধ করছি।

নতুন প্রজন্মকে যুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম জানুক কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। কীভাবে বিজয় অর্জিত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম এসব জানলে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম আসবে। তারা দেশের জন্য কাজ করবে।

আক্ষেপ করে তিনি জানান, আজকে দেশপ্রেম যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে যাকে দেখতাম একজন সৎ মানুষ হিসেবে। এখন দেখি তার মধ্যেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। অর্থাৎ তিনি নিজেকে ভালো রাখতে পারছেন না। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। এ থেকে মুক্তি না পেলে যত উন্নয়নই হোক না কেন, এর সুফল এ দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে না, মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছাড়া।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী সাইদুর রহমান সাজু বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাঙালির বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপন করতে পারছি- এটা নিঃসন্দেহে অনেক ভালোলাগার। যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৮ বছর। ৫০ বছরে আমার কাছে একটা জিনিস অনুভ‚ত হয় সেটা হলো- প্রকৃত এবং অপ্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কিছু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কাগজ অনুসারে অনিয়মিত ছিল- এটা সত্য। কিন্তু নানা মন্ত্রণালয় ও জামুকা কর্তৃক বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধা যাছাই-বাছাই, অসত্যকে সত্য এবং সত্যকে অসত্যে পরিণত করা ইত্যাদি ঘটনা আমাদের পীড়া দেয়। এখন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা মাসিক ২০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছি। এই টাকার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাইনি। আমাদের চাওয়া ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতন-অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া। এজন্য বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। জীবনের বহু বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। কষ্ট করেছেন। আমরা এই অনুভ‚তি থেকে জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা করিনি।

তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে এখন দেশপ্রেম অনেক কম। শেখ হাসিনা বিশে্বর একজন সেরা এবং সৎ নেত্রী। কিন্তু একজন কখনোই একা একটা ভালো ভবন তৈরি করতে পারে না। আমরা প্রত্যেকে অসৎ, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সুতরাং রাজনৈতিক, সামাজিক আর অর্থনৈতিক – যেভাবেই বলি না কেন, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা সুস্থ মানসিকতায় নেই বললেই চলে।

তার মতে, ৫০ বছর আমাদের বড় সান্ত¡না হলো, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনা বিজয়ে পতাকা আমরা দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। ইনশাল্লাহ, বাংলাদেশ অনেক অনেক দিন টিকে থাকবে। আমার একটা আক্ষেপও আছে, এই দেশে যারা বিরোধী দলে আছে। সেই দলটি পাকিস্তানের আদলে চলে। এ দেশের আদলে চলে না। অথচ এই দেশের মানুষ একাধিকবার দলটিকে নির্বাচিত করে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে। এটা আমাদের মানসিকভাবে পীড়া দেয়। জাতিগতভাবে এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের।

Advertisement