বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি

বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে বলা হয় সে দেশের প্রবেশদ্বার। অন্য দেশে যাতায়াতে ওই বিমানবন্দর ব্যবহার করা হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হচ্ছে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার। এ বিমানবন্দরের পরিবেশের ‘আয়না’য় ভেসে ওঠে গোটা দেশের চালচিত্র। কারণ প্রতিদিন দেশি বিদেশিরা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই বিমানবন্দর দিয়ে আসা যাওয়া করছেন। অথচ সেই বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।

গতকাল সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় কখনো কখনো ফ্লাইটও মিস করছেন যাত্রীরা। শুধু তাই নয়, যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার, হয়রানি, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকান্ড এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফলে বিদেশিদের কাছে দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। গত কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে এবং খোঁজখবর নিয়ে ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র জানা গেছে। এছাড়াও সম্প্রতি বিতর্কিত রাজনীতিক সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান কানাডা ও দুবাই ঘুরে কোথাও ঢুকতে না পেয়ে ফের দেশে ফেরায় শাহজালাল বিমানবন্দরের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান হয়েছে। তিনি করোনার টিকা না নিয়েই বিদেশ গেছেন।

এদিকে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এলাকায় ‘স্থাপনা নির্মাণ’ কাজের কারণে গত ১০ ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা রানওয়ে বন্ধ রাখছে কর্তৃপক্ষ। এভাবে টানা ৬ মাস ফ্লাইট উঠানামা বন্ধ থাকবে। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তের কারণে যাত্রী সেবা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন যাত্রীরা । পরদিন বিমানবন্দরে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কোনো ফ্লাইট ছেড়ে যেতে পারেনি।

 ওই দিন রাতে গণধিকৃত ডা. মুরাদ হাসানের ফ্লাইটও প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে যায়। পরে অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে গত ১১ নভেম্বর ‘অব্যবস্থাপনায় চরম ভোগান্তি’ নামের আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয় দৈনিক ইনকিলাবে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত রোববার বিকেলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিদর্শনে যান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। এ সময় শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক তৌহিদ-উল আহসানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকের সাথে কথা বলেন তারা। এ সময় বিমানবন্দরে অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকারও করে দুঃখপ্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। এমনকি এসব ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে ফ্লাইট ছাড়ার ৮ ঘণ্টা আগে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আনার জন্য দায়সাড়া বক্তব্য দেন তিনি।

বিদেশগামী এবং বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরকে অনেকেই ভোগান্তির বিমানবন্দর হিসেবে অবিহিত করছেন। যাত্রীদের অভিযোগ, দুইবার নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে বিমানবন্দরে ঢুকতে হয় দীর্ঘ লাইন দিয়ে। ভেতরে ঢোকার পর টিকা ও কোভিড নেগেটিভ সনদের ওপর স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সত্যায়ন নিতে আবারও লাইন। এরপর বোর্ডিং পাস নেওয়ার পালা। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সেখানেও। ইমিগ্রেশন পুলিশের কাউন্টারগুলোতেও দীর্ঘ সারি। এতে বিমানবন্দরে একেক যাত্রীর তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কর্তৃপক্ষ চাইলে এগুলো দ্রæত সম্পন্ন করতে পারেন। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের যাত্রীদের ভোগান্তি আরো একদফা বেশি। সময়মতো কোভিড পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়ায় অনেক যাত্রী ফ্লাইট ধরতে পারছেন না। তার ওপর নতুন জটিলতা। হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণের জন্য গত ৯ ডিসেম্বর থেকে ৮ ঘণ্টা করে বন্ধ থাকছে শাহজালালের রানওয়ে। এ ছাড়া বিজয় দিবসের প্রদর্শনীর মহড়ার জন্য বন্ধ থাকছে আরো সোয়া দুই ঘণ্টা করে। সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।

জানা গেছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশের জন্য ৬টি গেইট থাকলেও যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে দুই থেকে তিনটি গেট। ফলে ব্যস্ত সময়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে যাত্রীদের। আর যাত্রীদের এমন লাইনে দাঁড় করানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে চলে ‘লাইন বাণিজ্য’।

গতকাল সরেজমিন বিমানবন্দর গিয়ে দেখা গেছে, শত শত যাত্রী টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। সিলেট থেকে আসা নিজাম উদ্দিন নামের এক যাত্রী ইনকিলাবকে বলেন, আমি যথাসময়ে বিমানবন্দরে আসি। তবে টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশের জন্য আমাকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে এক ঘণ্টা। পরে ভেরতে প্রবেশ করে আরো বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছি। দুবাই প্রবাসী নিজাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভেতের প্রবেশের পর ইমিগ্রেশনে অনেক হয়রানি করা হয়েছে আমাকে। আমার সব কিছু সঠিক থাকার পরও ইমিগ্রেশন অফিসাররা উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করেন। বিভিন্ন অযুহাতের মাধ্যমে আমার কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেয়ার পাঁয়তারা করেন। পরে দালালের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। এরপর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয় বলেও জানান তিনি।

তবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, করোনা সংক্রমণের সময়ে যাত্রী হয়রানির বিষয়টি শুধু আমাদের না, সব দেশেই হচ্ছে। আমাদের আন্তরিকতার কিছু অভাব ছিল, অস্বীকার করি না। আমাদের ব্যর্থতা আছে এখানে। যাত্রী যারা হয়রানির শিকার হয়েছে, তাদের সবার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

এদিকে, অশালীন বক্তব্য দিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানোর পর গত বৃহস্পতিবার রাত ১টা ২০ মিনিটে কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন ডা. মুরাদ হাসান। এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ইকে ৮৫৮৫-এ তিনি প্রথমে দুবাই যান, এরপর সেখান থেকে আরেকটি ফ্লাইটে কানাডার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তবে টরন্টোর পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয় কানাডীয় কর্তৃপক্ষ। এ সময় করোনার ডাবল ডোজ টিকার সনদ না থাকায় তাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ডা. মুরাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট ও কোভিড প্রোটোকল না মেনে মুরাদ কীভাবে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে কানাডায় গেলেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক তৌহিদ-উল আহসান বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে যেসব যাত্রী বাইরের দেশে যান, সেসব বহির্গমন যাত্রীদের স্বাস্থ্য সনদ চেক করা, ভ্যাকসিনেশন সার্টিফিকেট চেক করার দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নয়। আমরা ইমিগ্রেশন করি, যাত্রীদের সেবা দিই। ইমিগ্রেশন শাখা ইমিগ্রেশন করবে, স্বাস্থ্যের কাজ স্বাস্থ্য করবে। মুরাদ সংক্রান্ত তথ্য জানতে হলে আপনাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করলে তারা ভালো উত্তর দিতে পারবে। ডা. মুরাদের ভ্যাকসিনেশন সনদ ছাড়াই দেশের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি আপনাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এই বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারলাম।

এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট কাজ করে। ইমিগ্রেশনের কাজ করে পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি দেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কোভিড আসার আগেও কিন্তু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি ফরম পূরণ করতে হতো। এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এনবিআর কাজ করে কাস্টমসের। এ বিষয়টা যদি আমরা ক্যাব-এর পক্ষ থেকে করতে চাই তাহলে তা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। সদ্য অব্যাহতি নেয়া সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদের বিষয়ে আপনাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যারা আছেন তারা দিতে পারবেন।

Advertisement