ভোটের মাঠে পিতার বিরুদ্ধে পুত্র, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই

ভোটের মাঠে পিতার বিরুদ্ধে পুত্র, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই

সিলেটের জকিগঞ্জের একটি ইউপিতে পিতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পুত্র। আরেকটি ইউপিতে ভাইয়ের বিপক্ষে লড়ছেন ভাই। পিতা-পুত্রের ও ভাই বনাম ভাইয়ের ভোটযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এ দুটি ইউপিতে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণা।

সকাল থেকে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। একজন এ পাড়ায় ভোট চাইতে গেলে অন্যজন আরেক পাড়ায় গিয়ে ভোট চাইছেন। এ নিয়ে ভোটারদের মাঝে নানামুখী আলোচনা সমালোচনা চলছে।

পিতার বিরুদ্ধে পুত্র ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণে ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হবে তা নিয়ে বিশ্লেষণেরও কমতি নেই। আগামী ৫ জানুয়ারি পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনে এ উপজেলার ৯টি ইউপির সঙ্গে সুলতানপুর ইউনিয়নেও ভোটগ্রহণ করা হবে।

উপজেলার জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে সদস্য পদে আব্দুস সত্তারের সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছেন তার পুত্র আরিফ।

সুলতানপুর ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তার চাচাতো ভাই জাতীয় পার্টির প্রার্থী রিমন আহমদ চৌধুরী। তারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দুজনই বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জকিগঞ্জ সদর ইউপির ২নং ওয়ার্ডে মেম্বার পদে নির্বাচন করতে বেশ কয়েক দিন থেকে নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছিলেন আব্দুস সত্তার। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার কারণে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কৌশলী কারণে পুত্র আরিফকে দিয়েও মনোনয়ন দাখিল করান; কিন্তু প্রত্যাহারের দিন বাধে বিপত্তি।

শেষ পর্যন্ত পিতা-পুত্র কেউই প্রত্যাহার করেননি। ফলে পিতার বিরুদ্ধে ভোটের মাঠে পুত্র হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচন অফিস থেকে পিতা আব্দুস সত্তার পেয়েছেন টিউবওয়েল প্রতীক ও ছেলে আরিফ পেয়েছেন ফুটবল প্রতীক।

পিতা-পুত্র ছাড়া এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্রার্থীরা হলেন বর্তমান মেম্বার আজিজুর রহমান কালন (মোরগ প্রতীক) ও লুৎফুর রহমান (তালা প্রতীক)।

তবে এই প্রার্থীদের ছাপিয়ে ভোটারদের আলোচনা সরগরম পিতা-পুত্রের ভোটের লড়াই নিয়ে। পিতা-পুত্রের লড়াইয়ের সুযোগে ভোটের মাঠ দখল করে নিয়েছেন দুবারের মেম্বার আজিজুর রহমান কালন।

এ নিয়ে জকিগঞ্জ সদর ইউপির ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার পদপ্রার্থী আব্দুস সত্তার জানিয়েছেন, কৌশলী কারণে পিতা-পুত্র মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। পরে মোরগ প্রতীক পাওয়ার স্বার্থে তারা পিতা-পুত্র কেউই প্রত্যাহার করেননি। কিন্তু তারপরও মোরগ প্রতীক পাননি। এখন দুজনের দুটি প্রতীক হলেও একইসঙ্গে নির্বাচন করছেন।

তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ছেলে বাক্স রাখবে ১৫-২০টা পাইলে পাইবে। ছেলের কারণে ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব পড়েনি। এ নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। ‘কৌশল’ কাজে লাগিয়ে এই ভোটযুদ্ধে চমক দেখাতে চান তিনি বলে জানান।তবে এ নিয়ে ছেলে আরিফের মোবাইলে কল দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইলে কল করা হলে আরেকজন রিসিভ করে জানিয়েছেন, আরিফ ঘরে মোবাইল রেখে বাইরে গেছেন। কখন ফিরবেন জানা নাই।

হাইল ইসলামপুর এলাকার ভোটার কাজল আহমদ (৪২) বলেন, পিতা-পুত্রের ভোটযুদ্ধ নিয়ে নির্বাচনী মাঠে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। ভোটের মাঠে পিতা আব্দুস সত্তারকে মাঝে মধ্যে দেখা গেলেও তার ছেলে আরিফকে তেমন দেখা যাচ্ছে না।কাজলের দাবি, হয়তো পরিবারিক মনোমালিন্যতা থেকেই পিতা-পুত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

অন্যদিকে সুলতানপুর ইউপিতে টানা কয়েক বছর থেকে নির্বাচন করছেন ইকবাল আহমদ চৌধুরী একল। এর মধ্যে একবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত ইউপি নির্বাচনেও নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রফিকুল ইসলামের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি।

গত নির্বাচনে ইকবাল আহমদ চৌধুরী একল পরাজিত হওয়ার পর থেকেই নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে কাজ করছেন তার আপন চাচাতো ছোটভাই সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক রিমন আহমদ চৌধুরী।

কথা ছিল ভোটের আগে তাদের মধ্যে সমঝোতা হবে। যে কোনো একজন প্রার্থী হবেন। কিন্তু সেই সমঝোতা হয়নি শেষ পর্যন্ত। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন ইকবাল আহমদ চৌধুরী একল ও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন তার আপন চাচাতো ছোটভাই রিমন আহমদ চৌধুরী।

বিজয়ের আশা বুকে নিয়ে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই দুই ভাই ভোটের মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও। দুজন প্রার্থী হওয়ার কারণে তাদের নিজস্ব ভোট সেন্টারগুলোতেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। আপনজনরা অনেকটা বিব্রত হয়ে দোটানায় পড়েছেন। কোন প্রতীকে চাইবেন ভোট?

ওই দুই ভাই ছাড়াও এ ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম (আনারস), গত নির্বাচনের হেভিওয়েট প্রার্থী জালাল উদ্দিন (টেবিলফ্যান), খেলাফত মজলিস নেতা বুরহান উদ্দিন (ঘোড়া), উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক হাসান আহমদ (চশমা), আনোয়ার হোসেন হেলালী (মোটরসাইকেল)।

হালঘাট এলাকার ভোটার আব্দুল মতিন বলেন, নৌকার প্রার্থী ইকবাল আহমদ চৌধুরী যখন যে গ্রামে গণসংযোগে যান তখন ওই এলাকায় তার ছোটভাই লাঙ্গলের প্রার্থী রিমন চৌধুরী গণসংযোগে যাচ্ছেন না। একজনের প্রতি আরেকজনের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। নিজ ভোট সেন্টারগুলোতেও তাদের স্বপ্ন ভাঙতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ভোটের মাঠ কাবু করতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করছেন।

সুলতানপুর ইউপি আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, নৌকার প্রার্থী ইকবাল আহমদ চৌধুরী একলকে বিজয়ী করতে মাঠে কাজ করছেন নেতাকর্মীরা। তার চাচাতো ভাই জাতীয় পার্টির প্রার্থী হলেও ভোটের মাঠে প্রভাব পড়েনি। উন্নয়নের জন্য ভোটাররা নৌকার প্রার্থীকেই বিজয়ী করবেন।

সুলতানপুর ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব ওলিউর রহমান বলেন, দলীয় আদর্শগত দিক থেকে তারা দুই ভাই জাতীয় দুই প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী রিমন চৌধুরীর ক্লিন ইমেজ রয়েছে। তার বড়ভাই নৌকার প্রার্থী হলেও ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব পড়েনি। জাপার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নেতাকর্মীরা কাজ করছেন।

জাতীয় পার্টির দলীয় প্রার্থী রিমন চৌধুরী বলেন, তার বড়ভাই ইকবাল আহমদ চৌধুরীকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের চাপে তিনি প্রার্থী হয়েছেন। ভোটের মাঠে পারিবারিক সম্পর্ক মুখ্য বিষয় নয়। জনগণ পরিবর্তন চায়। ভোটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা প্রমাণ হবে। ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। বিজয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ইকবাল আহমদ চৌধুরী একল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ছোট ভাইয়ের কারণে নৌকা প্রতীকের ভোটে প্রভাব পড়বে না। উন্নয়নের জন্য ভোটাররা নৌকায় ভোট দেবেন। বিগত দিনে তিনি চেয়ারম্যান হয়ে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। গণসংযোগে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাড়া পাচ্ছেন। বিজয়ের ব্যাপারে তিনিও আশাবাদী।

Advertisement