সোনার বাংলায় আমরা কেউ ভালো নেই: সম্মেলনে হিন্দু নেতারা

সোনার বাংলায় আমরা কেউ ভালো নেই: সম্মেলনে হিন্দু নেতারা

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’-জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম লাইনটি টেনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত কুমার দেব যখন মঞ্চ থেকে বললেন সোনার বাংলায় আমরা কি ভালো আছি- তখন দর্শকাসনে বসা সারাদেশের হিন্দু নেতারা সমস্বরে বলেন-‘না আমরা ভালো নেই’।

বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলার মানচিত্রে গত দুর্গাপূজায় ইকবাল হোসেন যে কলঙ্ক রচনা করেছে তাতে কি হিন্দুদের কোনো দোষ ছিল-তখনো সমস্বরে জবাব- না, কোনো দোষ নেই। আমরা হিন্দুরা খেসারাত দিয়েছি। তবু আমরা দেশ ছাড়ব না। এদেশেই থাকব। প্রতিবাদ করব, প্রতিরোধ করব। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেয়া সারাদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রায় সবাই একই কথা বলেছেন। তাদের ভালো না থাকার বিষয়টি বক্তব্যের ক্ষোভের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

শুক্রবার (২৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গনে সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া সম্মেলনে সারাদেশের জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হিন্দু নেতৃবৃন্দ যোগ দেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার জন্য তিনি আসতে পারেননি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বক্তব্য রাখেন। সংগঠনের সভাপতি মিলন কান্তি দত্তের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলা পর্যায়ের নেতাদের বক্তৃতায় শুধু ভালো না থাকার বিষয় নয়, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ভিসামুক্ত চলাচলেরও দাবি জানানো হয়। এরআগে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আজ শনিবার পরবর্তী দু’বছরের জন্য সংগঠনের পরবর্তী নেতা নির্বাচন করা হবে।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে যারা যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা যদি মাঠে থাকেন তাহলে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলার কোনো সুযোগই থাকবে না। সাম্প্রদায়িক শক্তিও মাথাচড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেন, ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। উভয় দেশ শুধু ইতিহাস-সংস্কৃতিই ভাগাভাগি করে না, ধর্মনিরপেক্ষতা, পারস্পরিক সুযোগ-সুবিধাও ভাগাভাগি করে। বাংলাদেশকে ভারত সবসময় সমর্থন করেছে এবং করে যাবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের জায়গা দিন দিন আরো দৃঢ় হবে। তবে এখনো দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তিস্তা নদীর পানির সমস্যা সমাধান করতে পারলে দুই দেশের জনগণই লাভবান হবে। আমরা হিন্দুরাও আরেকটু শক্তি পাব। দেশে অসাম্প্রদায়িকতা বজায় রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের মাঠে থাকার কথা বলেন তিনি। একসময় তিনি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ভিসামুক্ত চলাচলেরও দাবি জানান।

সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস পাল বলেন, আগেও পূজা হয়েছে। তখনতো বলতে হয়নি, ধর্ম যার যার-উৎসব সবার। এখন কেন এসব বলতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগে ‘কাউয়া’ ঢুকেছে। এই কাউয়াদের না তাড়ালে হিন্দুরা শান্তিতে থাকতে পারবে না। এরাই আওয়ামী লীগের নামে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন করছে। সাংবাদিক ও সমাজকর্মী সুভাষ সিংহ রায় বলেন, আমরা হিন্দুরা আমাদের মূল সংকটের কথাটাই বলতে পারছি না। এই না বলাটাও একটা সংকট। এই সংকট কোথায়?

সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, দেশের ৫০ বছর চলছে। ৫০ বছর আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতন চলমান। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়ও এটি আমাদের দেখতে হয়েছে। সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করে আমাদের হিন্দুদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে। আমরা হিন্দুরা যদি সাংগঠনিক শক্তি দেখাতে না পারি, ঐক্যবদ্ধ না হতে পারি তাহলে মুক্তির কোনো পথ নেই। কাজেই চুপচাপ ঘরে বসে থাকলে হবে না।

সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার সাবেক সভাপতি ডি এন চ্যাটার্জি বলেন, দেশের ৫০ বছর পরে এসে হিন্দুদের ভাবতে হচ্ছে পরবর্তী ৫০ বছরে কী হবে? সংগঠনের ফেনী জেলা শাখার সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান সুশেন চন্দ্র শীল বলেন, গত দুর্গাপূজায় আমরা কেন সুরক্ষা দিতে পারিনি, এটা ভাবতে হবে। এটা কি আমাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা না রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব।

সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক স্বপন সাহা বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা লোকরা বিশৃঙ্খলা করছে। এই ঘাপটি মারা লোকদের বিদায় জানাতে আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান চালানো প্রয়োজন।

সংগঠনের সাবেক সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ১৯৬৪ সালে ঢাকায় হিন্দুদের ওপর যখন নির্যাতন হয়েছিল তখন তাদের বাঁচাতে বঙ্গবন্ধু লুঙ্গি পরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর আজ তার দল ক্ষমতায় থাকলেও গত দূর্গাপূজায় আক্রমণের সময় আমাদেরকে বাঁচাতে আওয়ামী লীগের কাউকে ছুটে যেতে দেখিনি।

সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক বলেন, সংবিধান পরিবর্তন করে পাকিস্তানি ভাবধারা প্রবর্তন করা হয়েছে। এটির পরিবর্তন করতে হবে। পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সন্তোষ শর্মার সঞ্চালনায় এতে আরো বক্তব্য দেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক জে এল ভৌমিক, সদস্যসচিব প্রফেসর ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার।

Advertisement