প্রিপেইড মিটারের টাকা চুরি

প্রিপেইড মিটারের টাকা চুরি

এক সময় বলা হতো, মিটার রিডাররা ইচ্ছামতো গ্রাহকের কাছ থেকে বিল নিচ্ছে। সেই বিদ্যুতের চুরি রোধ এবং অপচয় কমাতে সারা দেশে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার লাগানোর কাজ প্রায় শেষ করেছে। বাড়তি বিলের কোনো সুযোগ নেই- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ থেকে বলা হলেও এখন গ্রাহকদের নিজের টাকায় মিটার ও প্রিপেইড কার্ড কেনার পরও প্রতিমাসে মিটার ক্রয় বাবদ সিঙ্গেল ফেজের জন্য কিস্তিতে ৪০ এবং থ্রি ফেসের জন্য ২৫০ টাকা ভাড়া আগেই কেটে নেয়া হচ্ছে। তবে এ ভাড়া কত বছর দিতে হবে তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। প্রতি মাসে কার্ড রিচার্জ করলে যে টাকা কেটে রাখা হয় তা হচ্ছে, গ্রাহকের ডিম্যান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাট। প্রতি মাসে একবার করে এ টাকা কাটা হয়। শুধু মিটার ভাড়া ছাড়া ডিম্যান্ড চার্জ এবং ভ্যাট পোস্টপেইড গ্রাহক আগে থেকেই দিয়ে আসছে।

এদিকে ৫৯৪ কোটি ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ১০০ টাকা বকেয়া বিলের বিপরীতে সারা দেশে ২১ হাজার ৮৩৮টি মামলা গ্রাহকদের বিরুদ্ধে করেছে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি। কোম্পানিগুলোর মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের মামলার সংখ্যা বেশি হলেও তাদের বকেয়া অর্থের পরিমাণ কম। অপরদিকে ডেসকোর মামলার সংখ্যা কম হলেও তাদের টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। আবার অনেক জেলায় বিনা কারণে গ্রাহকদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। সারা দেশে ৪০ থেকে ৫০ লাখ প্রিপেইড মিটার লাগানো হয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। বরং গ্রাহদের সেবা দেয়ার নামে বছরে বছরে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। গ্রাহকের টাকায় কেনা মিটার ও কার্ড নেয়া হলেও মাসে মাসে নেয়া হচ্ছে সার্ভিস চার্জ। এ চার্জের টাকা সরকার না পেলেও পাচ্ছে বেসরকারি কোম্পানির মালিকরা। গত ১২ বছরে এভাবে জনগণের কাছ থেকে কত হাজার কোটি টাকা যে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে, এর কোন হিসেব নেই বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে।

এদিকে ১২ বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন এবং সংযোগ বাড়লেও দাম কমেনি। গত বছর গ্যাসের প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটি তিতাস গ্যাস টিঅ্যান্ডডি কোম্পানির অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া, গ্যাসের বিল হালনাগাদ করাসহ সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বকেয়া গ্যাস বিল যথাসময়ে আদায় করার সুপারিশ করে। এছাড়াও প্রিপেইড মিটার গ্রাহকদের হয়রানি বন্ধ করতে বলে।
বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান এ বিষয়ে ইনকিলাবকে বলেন, সরকারের পলিসি হচ্ছে, যতদিন গ্রাহককে আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে মিটার দেওয়া হবে, মেরামত ও সংরক্ষণ করবে ততদিন সিঙ্গেল ফেজের জন্য ৪০ এবং থ্রি ফেজের জন্য ২৫০ টাকা করে ভাড়া দিতে হবে। অদূর ভবিষ্যতে খোলাবাজারে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার কিনতে পাওয়া যাবে। তখন গ্রাহক নিজে বাজার থেকে কিনে লাগালে তাকে আর ভাড়া দিতে হবে না। তিনি বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির মিটার কেনার কারণে দাম ভিন্ন হয়। আগে একটি মিটার কিনতে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা লেগেছে। এখন ৫ হাজার টাকার মতো পড়ছে। তবে দাম ক্রমেই কমে আসছে।

ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিকাশ দেওয়ান ইনকিলাবকে বলেন, আমাদের এ পর্যন্ত মিটার লাগানো হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ। আরো কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের ইনভেস্টমেন্টটা উঠে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রাহককে ভাড়া দিতে হবে। মিটারগুলো একেক সময়ে একেক দামে কেনা হয়েছে। একজন গ্রাহককে ভাড়া দিতে হবে। শুধু মিটার ক্রয়মূল্যের ওপর খরচ নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ডিপিডিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আজিমপুরে প্রথমে প্রিপেইড মিটার লাগানো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৩ হাজার মিটার লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গেল ফেজ ৫ লাখ ২০ হাজার এবং থ্রি ফেজ ৫২ হাজার টাকা। এছাড়া ৪টি প্রকল্প চলমান আছে।

গত বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কার্যপত্র মামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চার হাজার ৪৬৬টি মামলায় টাকার পরিমাণ ৫৮ কোটি ২৭ লাখ ৫৪ হাজার ১৩৪ টাকা, ডিপিডিসির ৩ হাজার ৫৩৮টি মামলায় বকেয়া টাকার পরিমাণ ১৮৪ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার ৮৯৭ টাকা, ডেসকোর ১৪টি মামলায় টাকার পরিমাণ ১৩৯ কোটি ৯৯ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬২ টাকা, নেসকোর ৩ হাজার ৯৮৮টি মামলায় বয়েকায় টাকার পরিমাণ ৪৩ কোটি ৯১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৫ টাকা এবং ওজোপাডিকোর ৪৭টি মামলার বকেয়া টাকার পরিমাণ ১১৪ কোটি ৯৬ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৮ টাকা এবং পল্লী বিদ্যুতের ৯ হাজার ৮৪৫টি মামলায় টাকার পরিমাণ ৩২ কোটি ২৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫৪ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৬টি বিদ্যুৎ কোম্পানি মোট ৪২ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৪টি প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। বিতরণ সংস্থাগুলো ২০২৪ সালের মধ্যে তাদের সব মিটার প্রিপেইড করার টার্গেট নির্ধারণ করেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সালমা রশিদ ইনকিলাবকে বলেন, আগে এনালগ মিটারে বিল আসত ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। এখন প্রিপেইড মিটার লাগানোর পর রিচার্জ করতে হচ্ছে ৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিমাসে মিটারের ভাড়া কেটে নেওয়া হচ্ছে। এটা কতদিন দিতে হবে? কার্ডে টাকা ভরার সঙ্গে সঙ্গে কেটে নেয়া হচ্ছে। কে নিচ্ছে তা জানি না।

রাজধানীর শ্যামলী এলাকার বাসিন্দার সাইফুর নাহার বলেন, আগে নরমাল বিল আসতো সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা। প্রিপেউড কার্ড দেওয়ার পরে সেই বিল আসতেছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।
প্রিপেইড মিটারের ভাড়া বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন ইনকিলাবকে বলেন, প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। ২০১৬ সালে যখন প্রথম প্রিপেইড মিটার কিনেছিলোম তখন ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা করে পড়েছিল। আমরা মান্থলি ইনস্টলমেন্ট করেছি ৪০ টাকা। লাইফটাইম ধরা হয়েছে ১০ বছর। এ সময়ের মধ্যে মিটার বদলাতে হলে বদলে দেব। ঠিক করতে হলে ঠিক করে দেব। তিনি বলেন, এর বিকল্পও আমরা চিন্তা করছি।

ডিপিডিসির ৫ লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপন প্রজেক্ট ডিরেক্টর আব্দুল মতিন ইনকিলাবকে ফোনে বলেন, বিভিন্ন প্রজেক্টে নানা দামে মিটার কেনা হয়। এখন সিঙ্গেল ফেজ মিটারের দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০০ থেকে ৩ হাজার এবং থ্রি ফেজ মিটারের দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পড়বে। এখনও কোনো মিটারের বয়সই ৬ বছর হয়নি। এসব মিটারের লাইফ ধরা হয়েছে ৭ থেকে ৮ বছর। এরপর চেঞ্জ করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোম্পানি চাইলে টাকা নিতে পারে, নাও নিতে পারে। এগুলো মেরামত করতে যে টাকা খরচ হয়, তার চেয়ে নতুন লাগানোই ভালো।

জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা ঢাকাসহ সারা দেশে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ করেছে। সেগুলো হচ্ছে, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি), পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও নর্দার্ন ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। খোলাবাজার থেকে গ্রাহক পছন্দমতো মিটার কিনে জমা দেবে, কোম্পানীগুলো পরীক্ষা করে তা স্থাপন করব। এজন্য মিটার তত্ত¡াবধান প্রক্রিয়াটা তৈরি করতে হবে আগে। এখনও তা হয়নি। সেগুলো হলে এ পদ্ধতিতে যাব। এটা করতে ২ থেকে ৩ বছর লাগবে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি গ্রাহক রয়েছে। তার মধ্যে এখন ৪০ লাখের অধিক গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার লাগানো হয়েছে। আরো ৩ কোটি গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। প্রিপেইড মিটারে খরচ বেশি, গ্রাহকের এমন হাজার হাজার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট্র কোম্পানিগুলোর অফিসে পড়ে আছে, কোােন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বরং শত শত গ্রাহককে পাল্টা বিল ও লাইন সংযোগ কেটে দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, অভিযোগ থাকতেই পারে। এনালগ মিটারে ম্যানিপুলেট করার সুযোগ থাকে। সেটা গ্রাহক নিজেও করতে পারে, বিদ্যুতের লোকও করতে পারে, তৃতীয় কোনো লোকও করতে পারে। চালক গ্রাহক মিটার ডাইভার্ট করে অন্যের ওপর চাপিয়ে নিজের বিল কমাত। কিন্তু এখন সে সুযোগ নেই। অতিরিক্ত বিল আসার কোনো কারণ নেই। অভিযোগ তারাই করত যারা ম্যানিপুলেশন করে বিল কম দিত। এখন সে সুযোগ নেই। যারা ম্যানিপুলেটের সঙ্গে জড়িত তারা এগুলো বাজারে ছড়াচ্ছে, যাতে কর্মসূচি বানচাল হয়ে যায়। তারা আবার ধান্ধা করতে পারে।

ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) মো. গিয়াসউদ্দিন জোয়ার্দার ইনকিলাবকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুসারে মিটারের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। মোটামুটি বিনিয়োগ যখন উঠে যাবে, তখন মাসিক টাকা নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেহাল উত্তরের বিভাগ রংপুর। অঞ্চলটির মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি এখনও অনেক। বাধার মুখে পড়েছে এখানকার শিল্পের বিকাশ। পিডিবি আর নেসকো (নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি) বলছে, এ অঞ্চলের মানুষকে অনেক লোডশেডিং সহ্য করতে হয়। এর সঙ্গে লো ভোল্টেজের জট থেকেও বের হতে পারছে না রংপুরবাসী। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, গ্যাসের অপচয় রোধে আবাসিক ক্যাটাগরিতে ২০১১ সাল থেকে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়। এ ক্যাটাগরিতে গ্যাসের গ্রাহক সংখ্যা ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯ জন।

পেট্রোবাংলার আওতাধীন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি আবাসিক শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ করছে। এখনও পর্যন্ত নিজস্ব ও বৈদেশিক অর্থায়নে কয়েকটি প্রকল্পের আওতায় ২ লাখ ৭৩ হাজার ১০০ গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটি মনে করছে, এ কাজ যে গতিতে হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। এ নিয়ে বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

কমিটির সদস্য আছলাম হোসেন সওদাগর বলেন, কমিটি তিতাস গ্যাস টিঅ্যান্ডডি কোম্পানির অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া, গ্যাসের বিল হালনাগাদসহ সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বকেয়া গ্যাস বিল যথাসময়ে আদায় করার সুপারিশ করেছে।

0 মন্তব্যসমূহ