নিয়োগ না ‘কার্যভার’?

নিয়োগ না ‘কার্যভার’?

মাত্র আর ৯ দিন। এরপরই শূন্য হচ্ছে রাষ্ট্রের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রধান বিচারপতির পদ। এর আগেই সম্পন্ন করতে হবে এ পদে নিয়োগ। কিংবা প্রদান করতে হবে কার্যভার। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। এ কারণে সবার মনোযোগী দৃষ্টি এখন বঙ্গভবনের দিকে। প্রেসিডেন্ট কবে, কখন এ পদে নিয়োগ দেবেন, কাকে নিয়োগ দেবেন-এ প্রশ্নে ঘণিভূত এখন জল্পনা-কল্পনা।

আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত। এরই মধ্যে নিয়োগলাভে যোগ্য তিন বিচারপতির নাম প্রেসিডেন্টের টেবিলে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে যেকোনো সময় একজনকে নিয়োগ দিতে পারেন।

তবে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য থাকলে আপিল বিভাগের ‘কর্মে প্রবীণ’ বিচারপতিও প্রধান বিচারপতির কার্যভার প্রদানের সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে নিয়োগ দেয়া হবে নাকি আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার প্রদান করা হবে- বঙ্গভবনের এ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় এখন বিচারাঙ্গনের মানুষ।

এদিকে অবসরে যাওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হয় ২২তম প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে। অথচ কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন- তা গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সাব্যস্ত হয়নি। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ওইদিন শেষবারের মতো আপিল বিভাগের এজলাসে বসেন বিচারকার্য পরিচালনার জন্য। আবেগঘন বিদায়ী বক্তৃতায় তিনি বিচারপতি পদে নিয়োগে আইন প্রণয়ন অপরিহার্য বলে অভিমত দেন। যদিও ২৩তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হচ্ছে যথারীতি প্রথা অনুসারেই। দু’ধরণের প্রথা অনুসৃত হয়ে আসছে প্রধান বিচারপতির পদ পূরণে। একটি হচ্ছে আপিল বিভাগের বিচারপতিগণের মধ্য থেকে সিনিয়র বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া। আরেকটি সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে (সুপারসিড) আপিল বিভাগের যে কোনো একজন বিচারপতিকে বেছে নেয়া। এবার কোনটি অনুসৃত হবে-আন্দাজ করতে পারছেন না কেউই। কারণ এবার আপিল বিভাগে দৃশ্যমান দু’টি মানদন্ড। বয়সের সিনিয়রিটি। কর্মে সিনিয়রিটি।

বিদায়ী প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে বর্তমানে বিচারপতি মাত্র ৫ জন। সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে গেলে থাকছেন ৪ জন। ধারণা করা হচ্ছে, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অবসরে যাওয়ার আগে আপিল বিভাগে নিয়োগদানের মাধ্যমে বিচারপতিসংখ্যা বাড়ানো হবে। পরে আপিল বিভাগে বিদ্যমান বিচারপতিগণের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে।

সিনিয়রিটির নিরিখে নিয়োগ দেয়া হলে বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বসতে পারেন প্রধান বিচারপতির আসনে। তার পরপরই রয়েছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ননী এবং বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। কিন্তু বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও মো. নূরুজ্জামান ননী অবসরে যাবেন ২০২৩ সালে। এ বিবেচনায় কিছুটা বেশি সময় পাবেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। ৬৭ বছর পূর্ণ করে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি অবসরে যাবেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেলে তার মেয়াদকাল হবে এক বছর।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী নিয়োগ পেলে তার মেয়াদকাল হবে দেড় বছরের সামান্য বেশি। ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবসরে যাবেন তিনি। বিচারপতি নুরুজ্জামান ননী অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ১ জুলাই। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান অবসরে যাবেন ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি। এসব বিবেচনায় বিচারাঙ্গন সংশ্লিষ্ট কারো কারো মতে, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী কিংবা বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ননীকে দেয়া হতে পারে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে বিচারপতি নিয়োগে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি নেই। প্রধান বিচারপতি নিয়োগেরও নেই নির্দিষ্ট বিধি-বিধান। এখন পর্যন্ত হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ চলছে সংবিধানে উল্লেখিত এখতিয়ার অনুসারে। বিচারপতি নিয়োগ সম্পর্কে সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সহিত পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ দান করিবেন।’

প্রধান বিচারপতি নিয়োগটি এখনও প্রথা আশ্রিত। দীর্ঘদিনের অনুসৃত রীতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট আপিল বিভাগে কর্মরত বিচারপতিগণের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন। প্রেসিডেন্ট আপিল বিভাগের যে বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেবেন তার বিষয়ে সম্মতি দিয়ে প্রথমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন। মন্ত্রণালয় থেকে ওই বিচারপতির ব্যাপারে ফাইল তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের পর বিষয়টি প্রেসিডেন্টের কাছে যাবে। প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর প্রধান বিচারপতি নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দেয়া হলে কিংবা প্রধান বিচারপতির পদটি ‘শূন্য’ হলে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলে রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে ক্ষেত্র মতে অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত বা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করবেন।’

সংবিধানের এ দু’টি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি প্রাধান্য পেয়ে আসছে। কিন্তু সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার নজিরও দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে অনেক রয়েছে। যদিও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মতে, আপিল বিভাগের সিনিয়র বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা উচিত। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটির নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাবেক এ আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনার জন্য সিনিয়রিটির ভিত্তিতে শুধু প্রধান বিচারপতি নয়- আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও সিনিয়রিটির নীতি অনুসরণ করা উচিত। সংবিধানও সিনিয়রিটির ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের রীতির প্রতি সমর্থন রয়েছে।

একই প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে সংবিধানে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে যিনি কর্মে প্রবীণতম তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। যা বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। তাই রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে যেকোনো বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এ পর্যন্ত ২২ জন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত: ৮ জনের নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২ বার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একবার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্তত: ৫ বার সিনিয়রিটি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহা পদত্যাগ করলে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কর্মে প্রবীণ আপিল বিভাগের বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির ‘কার্যভার’ দেয়া হয়। পরে তাকে সুপারসিড করে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। ওই নিয়োগের কয়েক ঘণ্টা পর পদত্যাগ করেন আবদুল ওয়াহাব মিঞা।

সিনিয়রিটি লঙ্ঘনের রেওয়াজটি শুরু হয় ২০০৩ সালে বিএনপি’র সরকার আমলে। তারা বিচারপতি এমএম রূহুল আমিন ও মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে সুপারসিড করে বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে অবশ্য উভয়েই প্রধান বিচারপতি হন। বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম পরপর চার বার সুপারসিডেড হন।

আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে প্রথম আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ পায়। ওই বছর মার্চ মাসে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান ও বিচারপতি মো. আবদুল আজিজকে ৮ মার্চ এবং বিচারপতি বিজন কুমার দাস, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ও বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়োগ দেয়া হয় ১৬ জুলাই। ২০০৯ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি এম এম রূহুল আমিন অবসরে যান।

এ সময় আওয়ামী লীগ প্রথম কোনো প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ পায়। ওই সময় আপিল বিভাগের সিনিয়র বিচারপতি মো. ফজলুর করিমকে প্রধান বিচারপতি করে। তিনি অবসরে গেলে বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলামের প্রধান বিচারপতি হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে- এ চিন্তা থেকে ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর তাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়। ২০১০ সালে অবসরে যান বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম। ওইবছর ৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. ফজলুল করিম প্রধান বিচারপতি হন। ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অবসরে যান তিনি।

পরে কে হবেন প্রধান বিচারপতি- এ প্রশ্নে ধারণা করা হয়েছিল বিচারপতি এমএম মতিন সেটি হচ্ছেন। কারণ, তিনি প্রধান বিচারপতি হলেও সিনিয়র বিচারপতি হিসেবে এবিএম খায়রুল হকের প্রধান বিচারপতি হতে কোনো সমস্যা ছিল না। কয়েক সপ্তাহ পরই বিচারপতি এম এ মতিনের অবসরে যাওয়ার তারিখ ছিল। কিন্তু বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এম. এ. মতিনকে এক সঙ্গে একই বেঞ্চে আর দেখা যায়নি। প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১১ সালের ১৭ মে অবসরে যান এবিএম খায়রুল হক।

তার আগেই সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। ওই সময় সিনিয়র ছিলেন বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান। কিন্তু তাকে নিয়োগ না দেয়ায় ওইবছর ১২ মে আপিল বিভাগের সিনিয়র বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি।

Advertisement