বিদেশে কর্মী যেতে ভোগান্তি

বিদেশে কর্মী যেতে ভোগান্তি

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী যেতে ভোগান্তি ও বিড়ম্বনার শেষ নেই। পদে পদে হয়রানির কারণে কর্মী কম যাওয়ায় কমছে রেমিট্যান্স। দেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার বাজার খোলা নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। ওই দেশে জনশক্তি রপ্তানিতে ফের সিন্ডিকেট করা হচ্ছে- এমন খবরে রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স জটিলতায় ঝুলে গেছে কয়েক হাজার প্রবাসীর ভাগ্য। নতুন লাইসেন্স না পাওয়া এবং পুরনো লাইসেন্স নবায়ন করা নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে রেমিট্যান্সে। লাইসেন্সের আশায় থেকে শেষ হয়েছে অনেকের ভিসার মেয়াদ।

এনআইডি উইং, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দক্ষ জনশক্তি তৈরি প্রকল্পে সমন্বয়হীনতায় হাজার হাজার প্রবাসীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়ায় বিদেশে যেতে পারছেন না কয়েক হাজার মানুষ। ১০ অক্টোবর থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া শুরু হলেও নানা জটিলতায় পুরনো-নতুন মিলিয়ে এখনো আটকে আছে কয়েক লাখ আবেদন।

এদিকে সাত বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৭ সালে চালু হওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দেড় বছর পর সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্য ও বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগে ফের বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক দফা চিঠি চালাচালির পর এই বাজার আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও বাংলাদেশের শ্রমবাজার ফের সিন্ডিকেটের হাতে যাচ্ছে- এমন খবরে রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা ক্ষোভে ফুঁসছেন।

নতুন ২৫ জনের সিন্ডিকেটে পুরনো ১০ জন ভিন্ন নামে থাকছেন, এমন খবর প্রচার পেয়েছে। এজন্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক মালয়েশিয়ান নাগরিক কয়েক দিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। যিনি এর আগে ১০ জনের সিন্ডিকেটে গড়ার কলকাঠি নাড়েন। ফের সিন্ডিকেট হলে কর্মী যেতে লাগবে ৪ লাখ টাকার বেশি। আর সিন্ডিকেট না হলে লাগবে জনপ্রতি মাত্র ৬৫ হাজার টাকা। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠায় এমন অন্য ১৩ জনের নিয়মকে পাশ কাটিয়ে শুধু বাংলাদেশের জন্য সিন্ডিকেট করা হলে সাধারণ রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা যেমন কাজ হারাবেন, তেমনিভাবে কর্মীদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা। এর প্রভাব পড়বে শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে।

অবশ্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ডিসেম্বরে সমঝোতা চুক্তি হবে। এতে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। সব রিক্রুটিং এজেন্সির সমান সুযোগ থাকবে। জানুয়ারি থেকে কর্মী যাবে বলেও মনে করছেন তিনি।

অন্যদিকে ঢাকা-দুবাই-আবুধাবি-রিয়াদ-জেদ্দা-দাম্মাম রুটে বিমান ভাড়া এখন দ্বিগুণের বেশি, অনেক ক্ষেত্রে তিন গুণ। অথচ এর অর্ধেক টাকায় মিলে ইউরোপ-আমেরিকার টিকেট। বিমান মন্ত্রণালয় ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নীরব রয়েছে। এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সভাপতি মনছুর আহামেদ কালাম বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ারলাইন্সগুলোর সিন্ডিকেট করে অনৈতিকভাবে ভাড়া বৃদ্ধির করছে। এতে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন বিদেশগামী কর্মীরা। চড়া দামে টিকেট কিনতে না পেরে বিদেশগামী অসহায় কর্মীরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

হজ এজেন্সিজ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিযোগিতামূলকভাবে তিন গুণ ভাড়া বৃদ্ধি করছে। যার কারণে অভিবাসী কর্মীরা বিড়ম্বনার শিকার এবং অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সিজ ঐক্য পরিষদের সভাপতি এম টিপু সুলতান বলেছেন, সিন্ডিকেট করে বাড়ানো হয়েছে বিমান ভাড়া। বাড়তি বিমান ভাড়া নিয়ে কথা বলতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, প্রায় ১২ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে তিন বছর ধরে জটিলতা রয়েছে। এর মধ্যে দুই লাখ প্রবাসীর লাইসেন্সও রয়েছে। এছাড়া বিদেশ যাওয়ার জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে দেয়া আরো কয়েক লাখ মানুষের আবেদন আটকে আছে। ফলে গত তিন বছরে নতুন কোনো ড্রাইভার যায়নি বিদেশে। দেশে এসে আটকে পড়েন বিভিন্ন যানবাহনের দুই লাখ ড্রাইভার। এতে ইউরোপের বড় বাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ।

চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক জানিয়েছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে দেশে রেমিট্যান্স আসা কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। এর থেকে উত্তরণে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং বিএমইটির মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। বিদেশে কর্মী পাঠানো সহজ করা গেলে অর্থনীতির ধাক্কা দ্রুত সামলে ওঠা যাবে। তাদের মতে, বাড়তি বিমান ভাড়া, করোনা পরীক্ষার সনদ পেতে বিড়ম্বনা ও কোয়ারেন্টাইনের নামে ভোগান্তির কারণেও অনেকে বিদেশে যেতে পারেননি। এর প্রভাবও রেমিট্যান্সে পড়েছে।

জানা গেছে, ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করলেও প্রায় তিন বছর পর গত সেপ্টেম্বর থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। পরীক্ষা দেয়ার পরও যাদের লাইসেন্স নানা জটিলতায় আটকে ছিল, তাদেরও বায়োমেট্রিক কার্যক্রম শুরু করেছে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। অবশ্য সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে আটকে থাকা সাড়ে ১২ লাখ লাইসেন্সের প্রিন্ট অক্টোবর থেকে শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। চাপ কমাতে ছুটির দিনেও দেয়া হচ্ছে সেবা।

সূত্র মতে, কোন প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের হাতে তুলে দিবে লাইসেন্স, সেই চুক্তি নিয়েই আটকে ছিল বিআরটিএ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই কাজ শুরু করেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার মানুষের বায়োমেট্রিক করছে প্রতিষ্ঠানটি। মাদ্রাজ প্রিন্টার্সের দাবি, সারা দেশে স্থাপন হয়েছে ৬৯টি বায়োমেট্রিক মেশিন। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যাদের পাসপোর্টের তথ্যের মিল নেই, সেসব গ্রাহকের লাইসেন্স নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।

মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের মানবসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ বিন মোস্তফা জানান, যাদের তথ্য যাচাইবাছাই করার সময় অনেক গরমিল পাওয়া যায়, আবার তাদের ঠিক করে আনতে বলা হয়। এনআইডি ভুল থাকলে আবার তাদের অনুরোধ করা হচ্ছে সেটা ঠিক করে আনতে। বিআরটিএ বলছে, অক্টোবর থেকে আটকে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্টকার্ড ছাপার কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। ছয় মাসের মধ্যে আটকে থাকা ১২ লাখ ৪৫ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের কাজ শেষ করবে তারা।

বিআরটিএর রোড সেফটির পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব ই রাব্বানী বলেন, পুরনো যে ১২ লাখের বেশি লাইসেন্স পড়ে আছে, সেখানে সেনাবাহিনী কাজ করছে। কার্ড প্রিন্টিং হচ্ছে। এতে লাইসেন্স পাওয়া নিয়ে যে সমস্যা ছিল তার অবসান হয়েছে।

এদিকে গ্রাহকদের একটি বড় অংশ লাইসেন্স তৈরি হওয়ার পরও তা সংগ্রহ করছেন না। এই অবস্থায় বিআরটিএ কর্মকর্তারা বিপাকে রয়েছেন। তারা গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানোসহ বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে চলেছেন।

বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে গত ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনাবাহিনীর বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) থেকে ১০ হাজার ২০৭টি স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স পাঠানো হয়েছে। তার মধ্যে চার হাজার ১৯৪টি ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করা হয়েছে গ্রাহকদের কাছে। বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে পড়ে আছে বাকি ছয় হাজার ১৩টি স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স। এসব স্মার্টকার্ড লাইসেন্স গ্রাহকরা নিতে আসেননি। আগে আবেদন করেছিলেন এমন গ্রাহকদের জন্য এসব স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করে বিআরটিএর কাছে সরবরাহ করছে বিএমটিএফ।

অন্যদিকে নতুন আবেদনকারীদের স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটিজ কোম্পানি। এই প্রতিষ্ঠান গত ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে সরবরাহ করেছে ১৮ হাজার ১৫০টি স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স। তার মধ্যে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে পাঁচ হাজার ২৬২টি। বাকি ১২ হাজার ৮৮৮টি লাইসেন্স পড়ে রয়েছে বিআরটিএর এই কার্যালয়ে। দুটো প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রায় ৬৭ শতাংশই বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে পড়ে আছে।

বিআরটিএর লাইসেন্স শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রাহকদের মোবাইল ফোনে বিআরটিএ থেকে এসএমএস পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু সাড়া দেয়ার প্রবণতা কম। প্রসঙ্গত, বিআরটিএর টেন্ডার জটিলতায় দেশজুড়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ ছিল ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে।

0 মন্তব্যসমূহ