৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণের অভিযোগে মামলা যেন পুলিশ না নেয়: বিচারক

৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণের অভিযোগে মামলা যেন পুলিশ না নেয়: বিচারক

রাজধানীর বনানীর ২৭ নম্বর রোডে দ্যা রেইন ট্রি হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার।

বৃহস্পতিবার (১১ নভেম্বর) তিনি রায়ের আদেশে বলেন, বাদীরা পূর্বেও শারিরীক কাজ করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় বাদীরা নিজ ইচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক করেন। এটি একটি ভিত্তিহীন মামলা। তাদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়নি। মেডিকেল রিপোর্টের সাথে বাদীদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। সাফাতের সাবেক স্ত্রী পিয়াসার প্ররোচনায় এ মামলাটি করা হয়েছে। এমন একটি ভিত্তিহীন সাজানো মামলায় আদালতের আজকে দিয়ে ৯৪ মূল্যবান কার্যদিবস সময় নষ্ট হয়েছে।

পাশাপাশি বিচারক আরও বলেন, ৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণের অভিযোগে কোনো মামলা যেন পুলিশ না নেয় সেই নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত।

এদিকে মামলাটি থেকে খালাস পেয়ে প্রধান আসামী সাফাত সবার সঙ্গে কোলাকুলি করে ভোরের কাগজকে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। আমরা আজ রেহায় পেলাম। আমরা কাউকে ধর্ষণ করিনি। মিথ্যা মামলায় এতো দিন সাজা খাটলাম। আমরা আনন্দিত।

সাফাত বাদে খালাস পাওয়া বাকি আসামিরা হলেন- নাঈম আশরাফ ওরফে এইচ এম হালিম, সাদমান সাকিফ, দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন। দেহরক্ষী ও গাড়িচালকের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত অভিযুক্তরা মামলার বাদী, তার বান্ধবী ও বন্ধুকে আটকে রাখে। অস্ত্র দেখিয়ে ভয় প্রদর্শন ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। বাদী ও তার বান্ধবীকে জোর করে একটি কক্ষে নিয়ে যায় আসামিরা। বাদীকে সাফাত আহমেদ ও তার বান্ধবীকে নাঈম আশরাফ একাধিকবার ধর্ষণ করে।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, সাদমান সাকিফকে দুই বছর ধরে চেনেন মামলার বাদী। তার মাধ্যমেই ঘটনার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সাফাতের সঙ্গে দুই শিক্ষার্থীর পরিচয় হয়। ওই দুই শিক্ষার্থী সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যান। সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী তাদের বনানীর ২৭ নম্বর রোডে রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে যান। হোটেলে যাওয়ার আগে বাদী ও তার বান্ধবী জানতেন না যে, সেখানে পার্টি হবে। তাদের বলা হয়েছিল, এটা একটা বড় অনুষ্ঠান, অনেক লোকজন থাকবে। অনুষ্ঠান হবে হোটেলের ছাদে।

সেখানে যাওয়ার পর তারা কাউকে দেখেননি। সেখানে আরও দুই তরুণী ছিলেন। বাদী ও তার বান্ধবী সাফাত ও নাঈমকে ওই দুই তরুণীকে ছাদ থেকে নিচে নিয়ে যেতে দেখেন। এ সময় বাদীর বন্ধু ও আরেক বান্ধবী ছাদে আসেন। পরিবেশ ভালো না লাগায় তারা চলে যেতে চান। এ সময় অভিযুক্তরা তাদের গাড়ির চাবি শাহরিয়ারের কাছ থেকে নিয়ে নেয় এবং তাকে মারধর করেন। ধর্ষণের সময় গাড়িচালককে ভিডিও করতে বলেন সাফাত। বাদীকে নাঈম আশরাফ মারধর করেন।

এ ঘটনার ১ মাস ৭ দিন পর একই বছরের ৬ মে বনানী থানায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে সাফাত- নাঈমসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

আসামিরা হলেন- নাঈম আশরাফ ওরফে এইচ এম হালিম, সাদমান সাকিফ, দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন। দেহরক্ষী ও গাড়িচালকের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার পরের মাসে ৫ জুন পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে মোট ৪৭ জনকে সাক্ষী করা হয়। এর পরের মাসে ১৩ জুলাই ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক শফিউল আজম পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারের আদেশ দেন। বিচারকাজ শুরু হলে ২২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

সর্বশেষ এ বছরের ৩ অক্টোবর মামলার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের সকল যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে রায় ঘোষণার জন্য ১২ অক্টোবর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। যুক্তি উপস্থাপনে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তাদের নির্দোষ দাবি করা হয়।

কিন্তু ১২ অক্টোবর বিচারক অসুস্থ থাকায় ও মামলার রায় প্রস্তুত না থাকায় রায় পিছিয়ে ২৭ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়। তবে ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার মারা যাওয়ায় আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি ধার্য করা হয়।

Advertisement