প্রতি কি.মি. ৬০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে লঞ্চ চালু

প্রতি কি.মি. ৬০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে লঞ্চ চালু

প্রতি কিলোমিটার ৬০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সারা দেশে আবারো লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। সর্বনিন্ম ভাড়া ১৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে। রবিবার (০৭ নভেম্বর) লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ৫ ঘণ্টা বৈঠক শেষে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এরপর রাতেই ঢাকার সদরঘাট টার্মিনালসহ দেশের বিভিন্ন বন্দর থেকে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী, নৌ-মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা। রাতের মধ্যেই এ অনুমোদন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিজেলের দামসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় শতভাগ ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে গত শনিবার থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ রেখেছিলেন মালিকরা।

বৈঠক শেষে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক জানান, লঞ্চে যাতায়াতকারী মানুষের বড় অংশই নিন্ম আয়ের মানুষ। ভাড়া বাড়ানোর আগে সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়েছে। মালিকদের দাবির পেছনেও যুক্তি আছে। সবদিক বিবেচনা করে আমরা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলে তা বাস্তবায়ন করা হবে। মালিকপক্ষ এতে সম্মত হয়েছেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৬০ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৩০ পয়সা ও পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা করা হয়েছে। লঞ্চের সর্বনিন্ম ভাড়া ১৮ টাকার পরিবর্তে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে বিকাল পৌনে ৪টায় মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ে কমডোর গোলাম সাদেকের সভাপতিত্বে বৈঠক শুরু হয়। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল সংস্থার (যা-প) চেয়ারম্যান মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদল ও লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি শহীদউল্লাহ ভূইয়া প্রমুখ ও বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে লঞ্চ মালিকরা শতভাগ ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানান। মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, গত ১৩ বছরে লঞ্চ ভাড়া বাড়ানো হয়নি। অথচ এর মধ্যে লঞ্চ মালিকদের খরচ অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, এর আগেও জ্বালানী তেলের দাম বাড়ানো হলেও লঞ্চ ভাড়া বাড়ানো হয়নি। এরপর শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। লঞ্চ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষনে খরচ বেড়েছে। স্টিলের দাম বেড়েছে। করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। সব মিলিয়ে মালিকদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। ঋণ করে বা ভর্তুকি দিয়ে কয়দিন চলা যায়। তাই যৌক্তিক পর্যায়ে ভাড়া বাড়ানো না হলে মালিকদের পক্ষে আর লঞ্চ চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এখন প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ডেকের ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা (প্রতি কি.মি) নির্ধারিত রয়েছে। এরপর ১ টাকা ৪০ পয়সা। সেটি বাড়িয়ে যথাক্রমে ৩ টাকা ৪০ পয়সা ও ২ টাকা ৮০ পয়সা করতে হবে। তবে বিআইডব্লিউটিএ প্রথমে ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে রাজি হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে একমত হন সবাই।

এদিকে, লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বিতীয় দিনেও দুর্ভোগে পড়েন দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা। সদরঘাট টার্মিনাল ঘুরে আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রকি আহমেদ জানান, অনেকেই লঞ্চ চালুর আশায় ঘাটে এসে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরে যান। আব্দুল আক্কাসের বয়স ৬৫ বছর। লাঠি ভর দিয়ে ডাক্তার দেখাতে ভোলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফেরার সময় বিপাকে পড়েন। তিনি জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরতে না পারায় সেখানেই রাত যাপন করেন। পরে সকালে আবার আসেন লঞ্চঘাটে। কিন্তু সারাদিন গড়ালেও দেখা মেলে না লঞ্চের। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি মুরুব্বি মানুষ। অনেক পথ হেঁটেছি। আমার কাছে বেশি টাকা নাই। শেষ পর্যন্ত গ্রামে ফিরতে পারব কিনা জানি না।

রবিবার সারাদিন সদরঘাট থেকে শুধু বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ মধুমতি ছাড়া অন্য কোনো লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। তবে ঘাটে ভিড়েছে বেশ কয়েকটি লঞ্চ। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্মপরিচালক জয়নাল আবেদিন জানান, সকালে বিভিন্ন জেলা থেকে ৮৮ টি লঞ্চ ঢাকায় আসার কথা থাকলেও আসে ৩৪ টি। এছাড়া বিকালের পর সরকারি জাহাজ এমভি মুধমতি বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। রাতে লঞ্চ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর নদীতে নোঙর করে রাখা লঞ্চগুলো যাত্রী তোলার জন্য ঘাটে ভেড়ে।

প্রসঙ্গত, সরকার গত বুধবার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়ায়। পরদিন বৃহস্পতিবার এলপি গ্যাসের দামও বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। এর জেড়ে শুক্রবার ভোর থেকে সারা দেশে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এরসঙ্গে শনিবার যুক্ত হন লঞ্চ মালিকরাও।

Advertisement