সিএনজিচালিত বাস বন্ধ কেন

সিএনজিচালিত বাস বন্ধ কেন

ডিজেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া পরিবহন ধর্মঘটের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীসহ বিভিন্ন মহল বলছে, দাম বেড়েছে ডিজেলের। কিন্তু ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে সিএনজিচালিত বাসগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে। সিএনজিচালিত বাস চলতে তো কোনো সমস্যা নেই। ঢাকায় যেসব বাস চলছে সেগুলোর সবই সিএনজিচালিত। সেগুলো এখন সড়কে নেই কেন?

এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে জানা যায়, কয়েকটি কারণে সিএনজিচালিত বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশে ডিজেলচালিত ও সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া একই। সরকারের পক্ষ থেকে সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া আলাদ করে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। ঢাকায় সিএনজিচালিত বাসে যে ভাড়া নেয়া হয়, ডিজেলচালিত বাসের ভাড়াও একই হারে নেয়া হয়। এ কারণে ডিজেলের দাম বাড়ানোর সুযোগে বাস ভাড়া বাড়ানো হলে সিএনজিচালিত বাসের মালিক-শ্রমিকরাও লাভবান হবে। এ কারণে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর দাবির সঙ্গে সিএনজিচালিত বাসের মালিকরাও সুবিধা আদায়ে সমর্থন স্বরূপ বাস চালানো বন্ধ রেখেছে।

দ্বিতীয়ত, সিএনজিচালিত বাসের মালিকরা ধর্মঘটের মধ্যে বাস চালালে ডিজেলচালিত বাসের মালিক-শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত হবে। তারা সড়কে বাধার সৃষ্টি করবে এবং ভাঙচুরও করতে পারে। ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্যই সিএনজিচালিত বাসগুলো রাস্তায় নামানো হয়নি।

তৃতীয়ত, ডিজেলচালিত ও সিএনজিচালিত সব বেসরকারি বাসের মালিকরাই একই সমিতির অন্তর্ভুক্ত। তাই সমিতির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সিএনজিচালিত বাস মালিক-শ্রমিকরাও ধর্মঘটের বাইরে থাকে না। এ কারণেই সিএনজিচালিত বাস চলছে না।

বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাজেদ রহমান জানান, রাজধানীর সব বাস সিএনজিতে চলে। এসব বাস না চলার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। কিন্তু সিএনজিচালিত বাস বন্ধ কেন? এই বিষয়ে সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। তারা কিছুই বলছে না। জনবান্ধব সরকার হলে ব্যবস্থা নিত।

আমিনুল ইসলাম নামে অপর এক যাত্রী বলেন, ভাড়ায়চালিত অ্যাপভিত্তিক প্রাইভেট কারগুলো সিএনজিতে চলে। বাস ধর্মঘটের সুযোগে তারাও কয়েকগুণ বেশি ভাড়ায় চলাচল করছে। এই দিকটিতে সরকার নজর দিলে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও উপকৃত হতো। এটা কি সরকার দেখতে পারত না?

নুসরাত জাহান নামের অপর এক যাত্রী অভিযোগ করেন, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বাস ধর্মঘট চলছে বলে জানি। কিন্তু সিএনজি-অটোরিকশাগুলো এখন আর মিটারে চলছে না। তাদের কয়েকগুণ বেশি ভাড়ায় চলাচলের প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারাও জনগণের পকেট কাটছে- সরকার এটাও দেখছে না।

সিএনজিচালিত বাস না চলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্ল্যাহ বলেন, আমরা সরকারের কাছে বাসের ভাড়া বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা বাস চলাচল বন্ধ রাখা বা পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণা দেইনি। বেশি দামে তেল কিনে লোকসান দিয়ে বাস চালাবে না- এটা যার যার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তারা তাদের বাস রাস্তায় নামতে দেয়নি। সিএনজিচালিত বাসের মালিকরাও তাদের বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে। এ কারণে ঢাকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সিএনজিতে চলা বাস বন্ধ রেখেছে। সিএনজিচালিত বাস চলাচল না করার ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই। মাত্র ২ ভাগ বাস এখন সিএনজিতে চলে। এর মধ্যে মিনি ট্রাকও রয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহসভাপতি আবুল কালাম জানান, ঢাকায় সিএনজিচালিত বাস চালানো সহজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট রুটের বাস সিএনজিতে চালানো সম্ভব। কিন্তু দূরপাল্লার সব রুটের যাত্রীবাহী বাস সিএনজিতে চালানো সম্ভব নয়। সব জায়গায় সিএনজি ফিলিং স্টেশন নেই। তাছাড়া সিএনজিচালিত বাসগুলো ধীর গতিতে চলতে হয়। হাইওয়েতে ধীর গতির বাস চালাতে চালকরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এ কারণে আগে সিএনজিতে রূপান্তরিত করা অনেক বাস আবার ডিজেলে ফিরেছে।

একাধিক পরিবহন নেতা বলেন, সিএনজির দামও দিন দিন অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন মালিকরা যাত্রীবাহী পরিবহনগুলো আবার ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করছেন। আবার অনেক রুটে সিএনজি ও ডিজেল এই দুই ধরনের জ্বালানির প্রয়োজন হয়। উত্তরবঙ্গ রুটের বগুড়ার পরে আর সিএনজি পাওয়া যায় না। তখন ডিজেলে চলতে হয়। সব সময় সব জায়গায় সিএনজি না পাওয়ায় এবং দাম বেড়ে যাওয়া ডিজেলের ওপর নির্ভর করা সহজ। তাছাড়া সিএনজিচালিত ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি। এক লিটার ডিজেলে যত দূরত্ব অতিক্রম করা যায়, সেই সমান দূরত্ব অতিক্রম করতে দুই ঘন ফুট সিএনজি লাগে। এখানেই খরচ বেড়ে যায়। সব জায়গায় তেল পাওয়া গেলেও সিএনজি পাওয়া যায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন নেতা জানান, সিলেট ও চট্টগ্রাম রুট ছাড়া প্রতিটি পরিবহন কোম্পানির বেশির ভাগ বাস ডিজেলে চলছে। সিএনজিতে যেগুলো চলছে সেগুলোও ডিজেলে রূপান্তরিত করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পর সিএনজি পাওয়া যায় না। সিএনজির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ডিজেলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। অন্যদিকে দাম ও দূরত্ব বিবেচনা করলে ডিজেল-সিএনজি প্রায় সমান।

Advertisement