জেলায় জেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, দ্বন্দ্বে স্থবির সংগঠন

 জেলায় জেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, দ্বন্দ্বে স্থবির সংগঠন

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আন্দোলনের মূল ঘাঁটি ঢাকা বিভাগে বিএনপির ১৭টি সাংগঠনিক ইউনিট এবং ৪টি মহানগরী রয়েছে- ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরী উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ ছাড়া বাকি ১৫ সাংগঠনিক জেলার কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। ঢাকা বিভাগে শতাধিক উপজেলা ও সাংগঠনিক থানা রয়েছে দুইশ’র বেশি। এর অধিকাংশই চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে। গত ২ বছরে ৩৩ জেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলোর প্রতি নির্দেশনা রয়েছে ৩ মাসের মধ্যে অধীন থানা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে।

চার বছর পরে নতুন নেতা দুই মহানগরে : ঢাকা মহানগর বিএনপিকে দুই ভাগ করে ২০১৭ সালে যথাক্রমে হাবীব উন নবী খান ও আবদুল কাউয়ুমকে সভাপতি করে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তরে প্রথম কমিটি দেয় বিএনপি। ওই কমিটিতে দক্ষিণে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল সূত্রাপুর এলাকার সাবেক কমিশনার কাজী আবুল বাশারকে। আর উত্তরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন কাফরুল এলাকার সাবেক কমিশনার আহসানউল্লা হাসান। চার বছর পর গত ২ আগস্ট হাবীব উন নবী খান ও আবদুল কাউয়ুমকে সরিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছে বিএনপি। উত্তরে কমিটিতে বিএনপি

চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানকে আহ্বায়ক এবং দলের ক্রীড়া সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবলদলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হককে সদস্য সচিব করা হয়। ৪৭ সদস্যের এই কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক রয়েছেন ১০ জন। আর আবদুস সালামকে আহ্বায়ক এবং রফিকুল আলম মজনুকে সদস্য সচিব করে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কেন্দ্র থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ কমিটি নিয়েও দলের ভেতরে ও বাইরে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।

২০১৮ সালের ৪ জুন উত্তরের অধীন ২৫টি থানা এবং ৫৮টি ওয়ার্ডে সাত সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয় কিন্তু অধিকাংশ আংশিক কমিটিই পূর্ণাঙ্গ হয়নি। অন্যদিকে দক্ষিণে ২০টি থানা এবং ১৪টি ওয়ার্ডে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাকি থানা ও ওয়ার্ডগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সাংগঠনিক কার্যক্রম।

ঢাকা মহানগরে বিএনপির নতুন কমিটি দ্রুত দলকে সংগঠিত করে আন্দোলন জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, অত্যন্ত সক্রিয়, সচল এবং কার্যকরী এই আহ্বায়ক কমিটি, তারা অতি দ্রুত দলকে সুসংগঠিত করবে এবং একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন করবে।
ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন বলেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই। রয়েছে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতা না থাকলে দলের প্রতি নেতাকর্মীদের টান বাড়ে না। তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ের কমিটি গঠনে ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের মূল্যায়নে আমরা সতর্ক রয়েছি।

মহানগর নিয়ে বিশেষ কর্মপন্থা হাই কমান্ডের : ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির থানা ও ওয়ার্ডে নতুন কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা আনতে বিশেষ কর্মপন্থা হাতে নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। নির্দেশ অনুযায়ী এর মধ্যেই ঢাকা উত্তর বিএনপির আটজন যুগ্ম আহ্বায়ককে সাংগঠনিক টিমের আহ্বায়ক করা হয়েছে। একেকটি টিমের নেতৃত্বে আছেন একজন যুগ্ম আহ্বায়ক। পাশাপাশি সংগঠনের আওতাধীন সব ওয়ার্ড কমিটি ভেঙে দিয়ে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে থানা কমিটি পুনর্গঠনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মহানগরীর মূল কমিটির নেতারা থানা কমিটিতে থাকতে পারবেন না। একই পদ্ধতিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপিও। মহানগরের নবনির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত দেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

মহানগর দক্ষিণের নতুন আহ্বায়ক আবদুস সালাম বলেন, উত্তর-দক্ষিণ মহানগর একসঙ্গে মিলেই সমবেতভাবে মহানগরীতে কাজ করার চেষ্টা করব, যাতে কোথাও কোনো ফাঁক সৃষ্টি না হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থাটাকে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করব, যাতে একটা কাউন্সিল করতে পারি। উত্তরের আহ্বায়ক জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক বলেন, যারা জিয়া পরিবারের প্রতি অনুগত ও আস্থাশীল তাদের সমন্বয়েই তৃণমূল কমিটি গঠন করা হবে। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে কার কী অবদান রয়েছে সে সব মূল্যায়ন করে আংশিক কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ করা হচ্ছে।

স্থগিত নারায়ণগঞ্জ থানা ও পৌর কমিটি : গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। ৪১ সদস্যের কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয় অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে। তবে সহসাই হচ্ছে না নারায়ণগঞ্জ জেলার ৭টি থানা ও পৌর বিএনপির কমিটি। প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে এসে স্থগিত হয়ে যায় কমিটি গঠন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক তৈমূর আলম খন্দকার জানান, ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে নারায়ণগঞ্জ জেলার সাত থানা ও পৌর বিএনপির কমিটি গঠন করা হবে। হঠাৎ করে কেন কমিটি গঠন স্থগতি করা হলো- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছু অভিযোগ রয়েছে। এটা শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জেনেছেন। তবে এটা দলের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। অনেক সময় সব কিছু বলাও যায় না।

কমিটি ঘোষণা দিয়েও স্বস্তি নেই মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইলে : দীর্ঘ ৫ বছর পর গত ২৫ আগস্ট ঘোষণা হয় মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। আগের সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনকে যথাক্রমে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব করে এ কমিটি দেয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হন জেলার নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রের দেয়া আহ্বায়ক কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে গঠন হয় পাল্টা কমিটি। ২ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জ প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও হরগঙ্গা কলেজের সাবেক ভিপি মো. রফিকুল ইসলাম মাসুমকে আহ্বায়ক ও মিয়া মো. বাবুল সরকারকে সদস্য সচিব করা হয়। পাল্টাপাল্টি কমিটিকে কেন্দ্র করে জেলায় সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন তারা।

জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম মাসুম বলেন, যাদের দিয়ে কেন্দ্র জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি করেছে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। পাঁচ বছরে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো কমিটি হয়নি। এমনকি জেলা কমিটিই পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। অথচ ব্যর্থ সেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিগত সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন তাদের বাদ দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, গত ৫ নভেম্বর টাঙ্গাইল জেলা কমিটি দেয়া হয়। সেখানে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘এক নেতা এক পদ’- মানা হয়নি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট আহমদ আযম খানকে জেলা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। আবার স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর (কারাগারে) পরিবারের কাউকে জেলা কমিটিতে পদ দেয়া হয়নি। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের একটি বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

Advertisement