তৃণমূলে বাণিজ্যের খেসারত!



চলমান ইউপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। তেমন আগ্রহ নেই অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও। পুরো মাঠ আওয়ামী লীগের একক নিয়ন্ত্রণে। দুই দফা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ২৮ নভেম্বর তৃতীয় আর ২৩ ডিসেম্বর চতুর্থ দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নিজ দলেরই একাধিক প্রার্থী। বিজয়ীও হচ্ছেন তাদের অনেকে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৪২ শতাংশ বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এসব প্রার্থীর প্রায় সবাই নৌকার মনোনয়ন চেয়েও পাননি। ফলে বিদ্রোহী হিসেবেই নির্বাচনের মাঠে লড়েন তারা। অনেক জায়গায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি নৌকার প্রার্থীরা। বাজেয়াপ্ত হয়েছে জামানত। বিদ্রোহীদের কাছে নৌকার প্রার্থী ধরাশায়ী হওয়াটা অনেকটাই ভাবিয়ে তুলেছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে। বিএনপি মাঠে না থাকলেও, বিদ্রোহীদের কাছে কেন হারছে দল মনোনীত প্রার্থীরা? এর কারণও খুঁজছেন দলটির সংশ্লিষ্টরা। আওয়ামী লীগের আসন্ন কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় বিষয়গুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে বলে জানা গেছে। তবে দলটির বেশির ভাগ নেতার মতে, বিদ্রোহীদের কাছে নৌকার পরাজয়ের নানা কারণ থাকলেও তৃণমূলে ভুল প্রার্থী বেছে নেয়াই প্রধানত দায়ী। অর্থের বিনিময়ে তারা অযোগ্য প্রার্থীর নাম বাছাই করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। আর তাদের বেশির ভাগই মনোনয়ন পাচ্ছেন। যারা যোগ্য, তারা বাদ যাওয়ায় অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাদেরকে মদত দিচ্ছে স্থানীয় সাংসদসহ প্রভাবশালী নেতারা। বিজয়ীও হচ্ছেন তারা।

জানা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ১ হাজার ১৯৮ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দলীয় বিদ্রোহী, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের কাছে ৪২৪ ইউপিতে পরাজিত হয়েছেন। অনেক ইউপিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামানতও হারিয়েছেন। ১৩১ ইউপিতে প্রতিযোগিতাই করতে পারেননি, এমনকি দ্বিতীয়-তৃতীয় অবস্থানেও ছিলেন না আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। শুধু ইউপি নয়, পৌরসভা নির্বাচনগুলোতেও নৌকার প্রার্থীরা হেরেছেন অনেক জায়গায়।

সদ্য অনুষ্ঠিত দুই দফায় ৪২৪টি ইউপিতে পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। ১৯ নভেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সেখান থেকে আসতে পারে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত।

আওয়ামী লীগের তিনজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনে বিএনপি মাঠে না থাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই মূলত নির্বাচনকে জমিয়ে রেখেছেন। নির্বাচনের মাঠ উত্তপ্ত হচ্ছে। কিন্তু হতাশার খবর হচ্ছে, দলের প্রার্থীরা নিজেরাই নিজেদের বিপক্ষে সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছেন। অনেকেই মারা গেছেন। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাদের একজন বলেন, একটি ইউপিতে গড়ে ৫ থেকে ৭ জন যোগ্য প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন চান। কিন্তু দল একজনকে মনোয়নের জন্য চূড়ান্ত করে। বাকি প্রার্থীরা ওই প্রার্থীর বিপক্ষে নানা কুৎসা রটাতে থাকে। তার সম্পর্কে যত নেগেটিভ প্রচারণা আছে, তার সবই করা হয়। তাদের অনেকেই আবার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। আর একই দলের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকায় ভোট ভাগাভাগি হচ্ছে। তাছাড়া দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন বাছাইয়ে দুর্বলতা ও সংসদ সদস্যদের নৌকার বিরোধিতার কারণে অনেক এলাকায় নৌকা হেরে গেছে। ফলে ইউপি নির্বাচনে দিন দিন আওয়ামী লীগের ভোট কমছে। বলা চলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, তৃণমূলে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। সেখানে ব্যাপক টাকার ছড়াছড়ি হচ্ছে। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কেউ কেউ অনেক টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। সবার প্রত্যাশা নৌকা পেলেই সহজে চেয়ারম্যান হওয়া যাবে। আর এ জন্য তৃণমূল থেকে যাতে কেন্দ্রে প্রথম সারিতে নাম আসে, সেজন্য আওয়ামী লীগের ওয়ার্ডের নেতা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করছেন প্রার্থীরা। সেখানে যে প্রার্থী বেশি টাকা খরচ করবে, সমর্থন সেই প্রার্থীর পক্ষে জোরালো হবে। শুধু ইউনিয়নেই নয়, কেন্দ্রে নাম পাঠাতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদেরও টাকা দিচ্ছেন অনেকেই। তাছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যদেরও একটা ভূমিকা থাকে। উপজেলা নেতারাও টাকার পরিমাণ অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় নাম তালিকা করে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে পাঠাচ্ছেন। জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরাও সেই তালিকায় স্বাক্ষর করে কেন্দ্রে পাঠাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা জেলা নেতাদেরও টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে থাকেন। অর্থাৎ যে প্রার্থী তৃণমূলে যত টাকা খরচ করতে পারবেন, তার নাম তত আগে থাকবে। সেই প্রার্থী যোগ্য হোক আর অযোগ্য হোক। তবে সবক্ষেত্রেই যে এমনটা ঘটছে তা নয় বলেও জানান আওয়ামী লীগের এই নেতা। ওই নেতার মতে এসব কারণেই যোগ্য ও সঠিক ব্যক্তিরা দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হচ্ছেন। ভোটাররাও প্রার্থীদের পছন্দ করছেন না। ফলে নৌকার প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করছেন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে তৃণমূলের নেতারা একে অপরকে রাজাকার, হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী উল্লেখ করে একের পর এক অভিযোগ জমা দিচ্ছেন। এসব অভিযোগ স্তূপাকারে জমা হচ্ছে। শুধু অভিযোগ দিয়েই তারা ক্ষান্ত হচ্ছেন না। নিজ নিজ এলাকায় চায়ের আড্ডায় একে অপরকে নানা বিশ্রী ভাষায় বিষোদগার করছেন। এসব অপপ্রচার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নৌকার প্রার্থীর বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। যার প্রভাব পড়ছে ভোটে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান এ সম্পর্কে বলেন, আওয়ামী লীগে মনোনয়ন বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই। কারণ দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেন আমাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। একেকটি ইউনিয়ন থেকে গড়ে ৩ থেকে ৭ জনের নাম কেন্দ্রে আসে। সবাই যোগ্য ও ত্যাগী। সবার সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে একজনকে চূড়ান্ত করা হয়। বাকি প্রার্থীরাও যোগ্য, তারা মনে করছেন তাদের কেন মনোনয়ন দেয়া হলো না। ফলে ক্ষোভ-অভিমানে মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের আঙ্গুল তোলেন। নিজেরাও নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। তাই অনেক জায়গায় দলের মনোনীত প্রার্থী হেরে যাচ্ছেন। তবে দলের বৃহৎ স্বার্থে ও জাতীয় নির্বাচনে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকার বিজয়ে কাজ করে, দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে।

Advertisement