হামলা রুখতে পারল না কেন মাঠ প্রশাসন

হামলা রুখতে পারল না কেন মাঠ প্রশাসন

সরকারের কঠোর নির্দেশনার মধ্যেও দেশের ২৩ জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর ও হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। হামলার শিকার একাধিক ব্যক্তি নিহতও হয়েছেন। এরপরই প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের তরফ থেকে বারবার কঠোর নিরাপত্তার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ দেখা গেল না কেন? কেনই বা গত বুধবার কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে হামলার পর দেশের অন্যান্য জেলায় হামলা ঠেকাতে পারল না প্রশাসন? কুমিল্লার পর মৌলবাদীরা দেশের অন্যান্য স্থানে এমন হামলা করতে পারে- এ ধারণা থাকার পরও কেন কঠোর থাকেনি পুলিশ? বুধবার হামলার পর কেন বিজিবি মোতায়েন করতে হলো, কেন মণ্ডপগুলোতে স্থায়ী আনসার মোতায়েন করা হয়নি? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মেলেনি পুলিশের পক্ষ থেকে। একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী কেউই ছাড় পাবে না। প্রধানমন্ত্রীরও এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, নোয়াখালীর বাণিজ্যিক শহর চৌমুহনীতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা ও দুজন নিহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল শনিবার প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। এই দিন প্রান্ত চন্দ্র দাস নামে নিহত এক ব্যক্তির লাশ নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে বিক্ষোভ মিছিল করলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। তবে এই

পুলিশই আগের দিন শুক্রবার বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে একের পর এক মন্দির যখন পুড়ছিল তখন কী করেছিল।
সৌরভ ভট্টাচার্য নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেন, নোয়াখালীর চৌমুহনীর পূজা কমিটির লোকেরা আগে থেকেই অনুমান করেছিল শুক্রবার জুমার পর সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ হতে পারে। তাই সারারাত জেগে পাহারা দিয়ে সকাল ১১টার মধ্যে তাড়াতাড়ি পূজা শেষ করে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিল। কিন্তু তাও শেষ রক্ষা হলো না। ঠিকই জুমার পর কম করে ১০০-১৫০ জন হাজির হয়ে প্রতিমা না পেয়ে মন্দিরে হামলা করে। মন্দিরগুলোর সিন্দুক ভেঙে স্বর্ণ, টাকা-পয়সা যা পেয়েছে তা লুটপাট করে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। চৌমুহনী বাজারের হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকান বেছে বেছে লুটপাট করে আগুন লাগানো হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার, মন্দিরের বড় লোহার গেইটগুলো ভাঙচুর করে ঢুকতে দুষ্কৃতকারীদের কম করে হলেও ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছে। কিন্তু ততক্ষণেও পুলিশ আসেনি। মন্দিরে হামলার ২ ঘণ্টা পর পুলিশ আসে। তিনি আরো লিখেন, চৌমুহনীতে তাণ্ডবের সময় নোয়াখালীর ডিসিকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ফোন দিলেও ডিসি না করে দিয়েছেন। যদিও গতকাল নোয়াখালীর পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম বলেন, বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।

শুধু চৌমুহনীর ঘটনাই নয়, কুমিল্লার ঘটনায়ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে পারেনি স্থানীয় থানা পুলিশ। কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ঘটনার পরপরই সাদা পোশাকে মন্দিরে যান। এরপর ওসি যে বক্তব্য দেন তা রেকর্ড করে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওসির সামনেই একজন উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে লাইভ করেন। এছাড়া কুমিল্লায় তিন দফায় মন্দিরে হামলা হলেও ফোন করে দীর্ঘ সময় পুলিশের সাহায্য পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাহুবলের একটি মণ্ডপের দুর্গা পূজার আয়োজক এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিবার মণ্ডপের নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়ে থাকে। তবে এবার তা করা হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারেন- এবার স্থায়ী আনসার নিয়োগ না দিয়ে শসস্ত্র টহল আনসার মোতায়ন করা হয়। যদিও হামলার পর নবমী ও দশমীর দিনে দুজন আনসার সদস্য পূজা মণ্ডপে মোতায়েন করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত বুধবার কুমিল্লার নানুয়ারদিঘি এলাকায় একটি পূজামণ্ডপে কথিত ‘কুরআন অবমাননার’ পর বিভিন্ন জেলায় পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। ওইদিন রাতেই কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পূজামণ্ডপে হামলা হয়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হয়। এছাড়াও খুলনায় রূপসা ফেরিঘাট এলাকার একটি মন্দিরের প্রবেশ পথের পাশ থেকে ১৮টি বোমা উদ্ধার করেছে র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পূজা কমিটি র‌্যাবকে বিষয়টি জানালে তারা এসে বোমাগুলো উদ্ধার করে। পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ২২টি জেলায় বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনকে পুরোপুরি ব্যর্থ মনে না করলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এসব বিষয়ে তাদের সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করছেন। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে সুবাতাস বইছে সেটি বিনষ্ট করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে। অল্পসময়ের মধ্যে এমন পরিকল্পিত ঘটনার যথাযথ তথ্য পাওয়া ও ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আর সুপরিকল্পিত হামলার ঘটনা একার পক্ষে ঠেকানো সম্ভব নয়। পূজার অনুষ্ঠানগুলোতে যদি আমরা রাজনৈতিক ও সামাজিক সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখতে পেতাম তাহলে তা সহজেই ঠেকানো যেত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি হামলা কেমন ও তার আকার প্রকৃতি কী হবে? তা ঘটা না পর্যন্ত প্রসাশন সাধারণত সম্যক ধারণা লাভ করে না। হামলা ঘটলে তা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করে। জঙ্গিবাদের বিষয়েও এমনটাই দেখেছি আমরা। তাই এসব বন্ধে রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন এমনকি সংখ্যালঘুদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটি ধারণা কাজ করে, নিরাপত্তা আমাদের অধিকার। আর তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। যদিও এমন দাবি তারা করতেই পারেন। তবে এর সঙ্গে সীমাবদ্ধতাগুলো দেখতে হবে। এসব কথা ভেবেই তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এমন ঘটনা রোধে আমাদের আরো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে।

বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, বেসামরিক প্রশাসন বিজিবি সহায়তা চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা এগিয়ে যাই। তবে হামলার পরও এর একটা রেশ রয়ে যায়। চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সময়টুকুর মধ্যেই হয়তো কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে বিজিবি মাঠে নেমে পরিস্থিতি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন ভোরের কাগজকে বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল সবসময়ই পরিস্থিতি ঘোলা করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। তবে এসব রোধে আমরা সবসময়ই সচেষ্ট রয়েছি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের চিহ্নিত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করে যাচ্ছে র‌্যাব। আমরা ইতোমধ্যে কুমিল্লার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। আরো বিষয়ে আমাদের কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা রয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্টকারীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না।

0 মন্তব্যসমূহ