খোঁজ মেলেনি তিন ছাত্রীর, ফের ২ কিশোরী নিখোঁজ

খোঁজ মেলেনি তিন ছাত্রীর, ফের ২ কিশোরী নিখোঁজ

রহস্যজনকভাবে রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে নিখোঁজ তিন কলেজ ছাত্রীর সন্ধান মেলেনি গত ৫ দিনেও। এরই মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের জনতা হাউজিং থেকে গৃহকর্মীসহ আরও দুই কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ৫ দিনে রাজধানী থেকে পাঁচ কিশোরী ও তরুণী নিখোঁজ হলেন। গত রোববার বিকালে মিরপুর-১ নম্বরের জনতা হাউজিং এলাকা থেকে নিখোঁজ হন স্কুলছাত্রী রোদেশী বিশ্বাস (১৪) ও গৃহকর্মী মেরিলা (১৩)।

গতকাল সোমবার মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাজিজুর রহমান জানান, নিখোঁজের ঘটনায় রোদেশীর পরিবার একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। রোদেশী একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত মেরিলা। তাদের সন্ধান পেতে কাজ শুরু করেছি।

পল্লবী থেকে নিখোঁজ তিন ছাত্রী দেশেই আছেন! : পল্লবী থেকে নিখোঁজ তিন ছাত্রী দেশেই আছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কাজী দিলখুশ জান্নাত নিসা, কানিজ ফাতেমা ও স্নেহা আক্তার পল্লবী এলাকার নিজ নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হন। তারা উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে জান্নাত নিসা মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট, স্নেহা পল্লবী ডিগ্রি কলেজ ও কানিজ ফাতেমা দুয়ারীপাড়া কলেজের ছাত্রী। তারা একে অন্যের বান্ধবী। এ ঘটনায় দিলখুশ জান্নাত নিশার বড় বোন কাজী রওশন দিল আফরোজ গত শনিবার রাতে বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় চারজনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। তাদের মধ্যে গ্রেফতার মো. রকিবুল্লাহর দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। অন্য তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। তারা হলেনÑমো. তরিকুল্লাহ (১৯), জিনিয়া রোজ (১৮) ও শরফুদ্দিন আহম্মেদ অয়ন (১৮)।

উদ্ধারে অভিযান চলছে, সীমান্তে নজরদারি:
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পারভেজ ইসলাম বলেন, নিখোঁজ তিন শিক্ষার্থী এখনো উদ্ধার হয়নি। অভিযান চলছে। সীমান্তবর্তী এলাকায়ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তাদের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কিনাÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি নিখোঁজ তিন শিক্ষার্থীর বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে তারা এখন পর্যন্ত দেশে আছেন বলেই আমাদের কাছে খবর রয়েছে। যেহেতু ওই শিক্ষার্থীদের কোনো পাসপোর্ট নেই, ধরেই নেওয়া যায় বৈধ উপায়ে তাদের দেশ ত্যাগের কোনো সুযোগ নেই। অবৈধ পথে যাতে তারা দেশ ত্যাগ করতে না পারে, সেটা নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের খুঁজে বের করতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।

তিন ছাত্রীর নিখোঁজের নেপথ্যে টিকটক!
তিন ছাত্রীর নিখোঁজের নেপথ্যে টিকটক চক্রের হাত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ যে চারজনকে গ্রেফতার করেছে, তাদের মধ্যে জিনিয়া টিকটক আসক্ত ছিল। মিরপুরের পল্লবীর একটি কলেজের শিক্ষার্থী জিনিয়া পড়ালেখার থেকে বেশি ব্যস্ত সময় পার করত টিকটকে। টিকটকের ভিডিও করতে মিরপুর, পল্লবী, বেড়িবাঁধ, দিয়াবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল জিনিয়ার। স্কুলে একসঙ্গে পড়ালেখার সুবাদে জিনিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় কাজী দিলখুশ জান্নাত নিসার। তার পাল্লায় পড়ে জান্নাতও মাঝেমধ্যে টিকটক করে নিজের ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করত। এছাড়া জান্নাতের সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া অপর দুই শিক্ষার্থীও নানা সময়ে জিনিয়ার পাল্লায় পড়ে টিকটক ভিডিও তৈরি করত।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যারা নিখোঁজ হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল টিকটকার জিনিয়ার। নিখোঁজ হওয়ার আগের সপ্তাহে তারা একসঙ্গে উত্তরার দিয়াবাড়ীর কাশবনে টিকটক ভিডিও করতে যায়। মামলার অন্যতম আসামি তরিকুল্লাহর পারিবারিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় সে রুটির দোকানে কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিংয়ের কাজ করত বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। টিকটকের ফাঁদে ফেলে তরিকুল্লাহ নিখোঁজদের বিদেশে পাচার করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তরিকুল্লাহর সঙ্গে পাচারকারী বড় কোনো চক্রের যোগসাজশ থাকতে পারে। প্রযুক্তিগত বিষয়ে অনেক বেশি দক্ষ হওয়ায় বিভিন্ন দেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করতো তরিকুল্লাহ।

নিখোঁজ শিক্ষার্থী কাজী দিলখুশ জান্নাত নিসা আইটি বিষয়ে জানার আগ্রহ থেকে নানা সময় তরিকুল্লাহর শরণাপন্ন হতো। এর সুযোগ নিয়ে তরিকুল্লাহ নিশাকে বিভিন্ন সময়ে জাপান এবং আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে বলে প্রলোভন দেখায়। জান্নাতের অপর দুই বান্ধবীর সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক থাকায় তারাও বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহী ছিল। তাদের বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এবং সার্টিফিকেটসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালাতে উৎসাহী করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, তিন ছাত্রীর নিখোঁজের ঘটনায় মানবপাচারকারী চক্রের পাশাপাশি টিকটক চক্রসহ সম্ভাব্য অপহরণকারী চক্র জড়িত কিনা তদন্ত চলছে।

এর আগে টিকটক চক্র ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নারী পাচার করেছিল। নিখোঁজ তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ছিল খুবই উচ্চাভিলাষী। ধারণা করা হচ্ছে তার সঙ্গে টিকটক চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। সে অন্য দুই শিক্ষার্থীকে কৌশলে সঙ্গে নিয়ে পাচারকারীদের সঙ্গে লাপাত্তা হয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ