১০ বছর ফাইলবন্দি বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প

১০ বছর ফাইলবন্দি বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প


দীর্ঘ ১০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প। যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের জুন মাসে। অথচ এখনও  শুরুই হয়নি এ প্রকল্পের কাজ। ২০১০ সালে রেলপথটি স্থাপনের জন্য এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রাক-সমীক্ষা করা হয়। অর্থ সংকটের কারণে দীর্ঘদিন আটকে ছিল প্রকল্পটি। ২০১৭ সালে ভারতের তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) অর্থায়নে রেলপথটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদনও পায়। উত্তরাঞ্চলবাসীর বহুল প্রত্যাশিত স্বল্প সময়ে অল্প খরচে, ঢাকা যাতায়াতের আকাক্সক্ষা এখন স্বপ্নই রয়ে গেছে। সরকারের এ পরিকল্পনা কত দিনে বাস্তবায়ন হবে তা  জানেন না কর্তৃপক্ষও। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সাথে বগুড়া জেলার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রায় ৭২ কিলোমিটার কমবে। ফলে আর্থিকভাবে লাভবান হতো এ অঞ্চলের যাত্রীরা।

এ দুই জেলার মধ্যে সরাসরি রেলপথ না থাকায় উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলোকে যাত্রী ও কৃষিপণ্য নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে বহুপথ ঘুরে ভোগান্তির শিকার হন।  বর্তমানে বগুড়াসহ এ অঞ্চলের জনগণের বগুড়ার সান্তাহার জংশন হয়ে নাটোর, পাবনা, ঈশ্বরদী, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া হয়ে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুতে পৌঁছাতে হয়। শুধু বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে তিনটি জেলার পথ ঘুরে বঙ্গবন্ধু সেতুতে পৌঁছাতে সময় লেগে যায় প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা। সেই সাথে প্রায় ৪০৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে দিনের অর্ধেক সময় নষ্ট হয়। এই সময়ের পরিমাণ প্রায় ৯ ঘণ্টা। এছাড়া বগুড়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত সড়ক পথে ২২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাসে ঢাকা যেতে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। সেখানে  বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুতে সরাসরি ট্রেনে পৌঁছাতে সময়ে লাগবে ১ ঘণ্টা থেকে সোয়া এক ঘণ্টা। অর্থাৎ এখন বাসে ঢাকায় যেতে ২২০ কিলোমিটার ও ট্রেনে যেতে পাড়ি দিতে হয় ৪০৫ কিলোমিটার। বগুড়া থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন সার্ভিস চালু হলে বগুড়াসহ উত্তরের জেলার ট্রেনযাত্রীদের প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ কমে আসবে। সেই সাথে খরচ কম পড়ায় উত্তরের ট্রেন যাত্রীদের আর্থিকভাবে সাশ্রয় হবে।

এদিকে উত্তরাঞ্চলের যাত্রীরা বিশেষ করে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট কুড়িগ্রাম জেলার ঢাকাগামী যাত্রীরা সড়ক পথে যাতায়াত করেন। এ কারণে সড়কে  সব সময় যানজট লেগেই থাকে। যানজটের কারণে ঢাকা পৌঁছতে যেমন বিলম্ব হয় তেমনি পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জসহ উত্তরের যাত্রীরা রেলপথ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলওয়ে বিভাগ প্রকল্পটি গ্রহণ করে ১৬ বছর আগে। এর প্রাক-সমীক্ষা করতেই লেগে যায় পাঁচ বছর। আর একনেকে অনুমোদন হয় তারও আট বছর পর। প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের তিন বছর পর। সেসময় কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের জুন মাসে। অথচ এখনও এর কাজেই শুরু হয়নি।

এ সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে  ভারতের ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। বাকি ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

কেন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বা এই বিলম্বের কারণ জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। তিনি এই প্রতিবেদককে যা জানালেন। প্রকল্প পরিচালকের কথায়, এ প্রকল্প দীর্ঘদিন অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ার কারণে প্রকল্পটি আটকে ছিল। তিনি জানান, পরে ভারতের তৃতীয় এলওসির মাধ্যমে প্রকল্পের বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এলওসির অর্থ ছাড়া ও পরামর্শ নিয়োগের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেছে। এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে এক বছর কোন কাজ করা যায়নি। এ সময় দাতা সংস্থারা ঢাকায় আসতে পারেনি। পরামর্শ প্রতিষ্ঠান আগামী এক বছরের মধ্যে রুটের নকশা চূড়ান্ত করা ও মূল ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করবে। এরপর ২০২৩ সালের প্রথম দিকে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে বলে তিনি এই প্রতিবেদকে জানালেন।



প্রকল্প সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন থেকে বগুড়া রেল লাইন পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার মূল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া কাহালু থেকে রানীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার রেলপথসহ মোট ৮৪ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মিত হবে। এর আড়াই কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে বগুড়া শহর থেকে রেল লাইন পর্যন্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করার কথাও জানালেন প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর।

এ বিষয়ে কথা হয় সুবিধাভোগী বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের একজন ঈমান আলী জানালেন, রেলপথটি নির্মাণ করা খুবই জরুরি। কারণ আমাদেরকে রাজধানীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে হলে এই রেলপথের বিকল্প নেই। রেলপথটি নির্মিত হলে আমরা অতি অল্প ব্যয়ে এবং স্বল্প সময়ে কোনরকম বিড়াম্বনা ছাড়াই ঢাকায় যাতায়াত করতে পারব।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা-বগুড়ার বর্তমান দূরত্ব ৩২৪ কিলোমিটার। নতুন রেলপথ নির্মাণ হলে এই দূরত্ব কমে হবে ২১২ কিলোমিটার। ১১২ কিলোমিটার দূরত্ব কমে আসবে। প্রকল্পের আওতায় ডুয়েলগেজের দুটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা হয়। বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট বেলাইল এলাকা থেকে সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত মূল রুট ৭২ কিলোমিটার এবং বগুড়ার কাহালু স্টেশন থেকে রাণীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারসহ মোট ৮৪ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ। বগুড়া শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে রাণীরহাটে জংশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রুটে শেরপুর, চাঁন্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, কৃষাণদিয়া ও সদানন্দপুর স্টেশন স্থাপন করা হবে। প্রস্তাবিত ৮৪ কিলোমিটার রেলপথের জন্য ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ায় ৫২ কিলোমিটার রেলপথের জন্য ৫১০ একর এবং সিরাজগঞ্জের ৩২ কিলোমিটারের জন্য ৪৫০ একর।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘এ লাইনটি তৈরি উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি। নতুন এ রেললাইনের মাধ্যমে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হবে, সময় কমে যাবে। বর্তমান সরকার রেল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থা যমুনা সেতু দ্বারা বিভক্ত। পশ্চিমাঞ্চলে মিটারগেজ লাইন এবং পূর্বাঞ্চলে ব্রডগেজ লাইন। বর্তমান সরকার সারাদেশকে একইভাবে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য পর্যায়ক্রমে ডাবল লাইন করা হচ্ছে।’

0 মন্তব্যসমূহ