দুর্নীতি ঢাকতেই নথি গায়েব!

দুর্নীতি ঢাকতেই নথি গায়েব!

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ থেকে ১৭টি নথি গায়েব হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ওই নথিগুলোতে কী ধরনের তথ্য ছিল? কে কি উদ্দেশ্যে নথি সরিয়েছে? আর এতে লাভবান হবে কারা? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে এর মধ্যে তদন্তে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), সচিবালয় পুলিশ ও শাহবাগ থানা পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। খোয়া যাওয়া নথিগুলোর বেশির ভাগ স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের অধীন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও বিভাগের কেনাকাটা সম্পর্কিত হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুর্নীতি থেকে কাউকে সুরক্ষা দিতেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে নথিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এদিকে সচিবালয়ের মতো সুরক্ষিত জায়গা থেকে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব হলেও থানায় মামলা দায়ের না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করায় রহস্য দেখা দিয়েছে। পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জিডি করলে তদন্তে গুরুত্ব দেয়া হয় কম। যদি সরাসরি মামলা দায়ের করা হতো তাহলে বিষয়টি তদন্তে আরো গুরুত্ব পেত। মামলার পরিবর্তে জিডি কেন দায়ের করা হয়েছে সে বিষয়ে অবশ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কমিটিকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সচিবালয়ের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) শাহাদাৎ হোসাইনের কক্ষের লাগোয়া ঘর থেকে নথিগুলো হারিয়ে যায়। শাহাদৎ হোসাইন সচিবালয়ের ৩ নম্বর ভবনের ২৯ নম্বর কক্ষে বসেন। পাশের কক্ষে বসেন ক্রয় ও সংগ্রহ শাখা-২ এর সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর মো. জোসেফ সরদার ও আয়েশা সিদ্দিকা। ফাইলগুলো এই দুই কর্মীর কেবিনেটে ছিল।

শাহবাগ থানা পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাদিরা হায়দার বাদী হয়ে একটি জিডি (নং ২০/১৭) করেন। তাতে বলা হয়েছে, গত বুধবার (২৭ অক্টোবর) অফিস করে নথিগুলো ফাইল কেবিনেটে রাখা হয়। পর দিন দুপুর ১২টায় কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় ফাইলগুলো কেবিনেটের মধ্যে নেই। যে নথিগুলো খোয়া গেছে, সেগুলোর সিংহভাগই স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের অধীন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও বিভাগের কেনাকাটা সম্পর্কিত। জিডিতে ১৭টি নথির নম্বর ও বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য মেডিকেল কলেজের কেনাকাটাসংক্রান্ত একাধিক নথি, ইলেকট্রনিক ডেটা ট্র্যাকিংসহ জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচি, নিপোর্ট অধিদপ্তরের কেনাকাটা, ট্রেনিং স্কুলের যানবাহন বরাদ্দ ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি। এর বাইরেও নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্পের নথি খোয়া গেছে। কে সরাল গুরুত্বপূর্ণ নথি, সে সম্পর্কে নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এ সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ থেকে ১৭টি নথি গায়েব হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দেশের অন্যতম সুরক্ষিত কার্যালয় থেকে নথি গায়েব হয় কীভাবে? অবশ্যই কেউ তুলে নিয়ে গেছে। তাহলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশও রয়েছে। কেননা, তাদের সহযোগিতা ছাড়া বাইরের কেউ নথি সরিয়ে ফেলতে পারবে না। যদি তাই যদি হয়, তাহলে কাউকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই নথি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কার স্বার্থে এগুলো সরিয়ে ফেলা হলো সেটি নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখা দরকার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

এদিকে নথি চুরির ঘটনায় জিডি হওয়ার পরপরই সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে ক্রাইম সিন ইউনিট সচিবালয়ে যায়। সিআইডির কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। জানতে চাইলে বিশেষ পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, জিডি অন্তর্ভুক্তির পর ছায়া তদন্তের অংশ হিসেবে আমরা ঘটনাস্থল ঘুরে এসেছি। যদি এ ঘটনায় মামলা হয়, আর তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে দেয়া হয়, তাহলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দেখা হবে। এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।

শাহবাগ থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার ভোরের কাগজকে বলেন, নথি হারানোর অভিযোগে একটি জিডি হয়েছে। শুক্র ও শনিবার সচিবালয় বন্ধ থাকায় আজ রবিবার তদন্ত করে দেখা হবে। মামলা না করে জিডি করা হলো কেন? জানতে চাইলে ওসি বলেন, এটা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি রমনা বিভাগের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, জিডি করা হলে পুলিশ কম গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মামলার গুরুত্ব সব সময় বেশি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি খোয়া যাওয়ার বিষয়টি অফিসিয়ালি আমাকে জানানো হয়নি। যদি থানা পুলিশ প্রয়োজন মনে করে, তাহলে জিডিকে মামলায় রূপান্তর করতে আদালতে আবেদন করবে। অধিক গুরুত্বের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন মামলা করল না? এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান পুলিশের এ কর্মকর্তা।

তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) শাহাদৎ হোসাইন জানান, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) শাহ্ আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অন্য দুই সদস্য হলেন- যুগ্ম সচিব (চিকিৎসা শিক্ষা) আহসান কবীর ও উপসচিব (চিকিৎসা শিক্ষা-১) মোহাম্মদ আবদুল কাদের। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ