টানেলের মুখে আলোক

টানেলের মুখে আলোক

নদীর তলদেশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুড়ঙ্গপথ। সেই পথ দিয়ে চলবে সব ধরনের যানবাহন। শুনলে মনে হয় রূপকথার সেই সোনার কাঠি রুপার কাঠির গল্প। তবে সেই গল্পকে সত্যি দেখতে আরও বছর দেড়েক অপেক্ষা করতে হবে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই ছুঁয়ে দেখা যাবে সেই স্বপ্নের টানেল।

দেশে প্রথমবারের মতো কোনো নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন এই টানেলের নাম রাখা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’। এতে খরচ হবে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। টানেলটি হলে দেশে জিডিপি শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ বেড়ে যাবে।

টানেলের এক মাথা শুরু হয়েছে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির পাশ থেকে। নদীর তলদেশ দিয়ে তা চলে গেছে আনোয়ারার দিকে। নদীর তলের এই পথের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। পুরো পথেই আপনি থাকবেন পানির অনেক নিচে। এখন যে পথ পেরোতে এক ঘণ্টা সময় লাগে, টানেল হলে লাগবে মাত্র পাঁচ মিনিট। এ টানেল ধরে চলে যাওয়া যাবে পর্যটননগরী কক্সবাজার ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর অবধি।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনার বাধা কাটিয়ে আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করেছি। আগস্ট মাস পর্যন্ত ৭২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। টানেলে ৩৫ ফুট প্রস্থের দুটি টিউব থাকবে। প্রতি টিউবে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। একটিতে শহর থেকে কক্সবাজারমুখী যানবাহন যাবে, অন্যটিতে আসবে। এ দুটি টিউবের খননকাজ শেষ।’

এখন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সফটওয়্যার নির্মাণের কাজ চলছে। এ ছাড়া টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তে ফ্লাড গেটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। টানেলের সঙ্গে সংযুক্তকারী দুটি রাস্তার নির্মাণকাজ চলছে। আর আনোয়ারা প্রান্তে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ ওভারব্রিজের কাজও অনেকটা এগিয়ে গেছে।

এতে আর কী কী থাকবে? জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক বলেন, টানেলে থাকবে আধুনিক লাইটিং, লাউডস্পিকার। এ ছাড়া ভূমিকম্প, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও পানি প্রতিরোধী করতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বের অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। মূল দুই টিউবের মাঝখানে তিনটি সংযোগ টিউব করা হচ্ছে। যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এক টিউব থেকে অন্য টিউবে চলে যাওয়া যায়।

কত গাড়ি চলবে এই টানেলে? তার হিসাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, প্রথম বছরে ৫০ লাখ যানবাহন এ টানেল পাড়ি দেবে। ২০৩০ সাল নাগাদ পার হবে ১ কোটি ৩০ লাখ গাড়ি। টোল বাবদ প্রথম বছরে আয় হবে ২০০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় বাঁচবে সময়। কর্ণফুলী সেতু দিয়ে পারাপারের চেয়ে প্রতিটি গাড়ি অন্তত ২০ মিনিট আগে নদী পার হবে।  

টানেল নিয়ে সরকারের এক সমীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, কর্ণফুলী নদীর শহরের পারে বন্দর, তেল শোধনাগার আর ছোট-বড় শিল্পকারখানা মিলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য। আর অন্য পারে আনোয়ারা, কর্ণফুলী, পটিয়া উপজেলা এখনো কৃষি, পশুপালন আর চাষাবাদনির্ভর। কিন্তু টানেল চালু হলে পাল্টে যাবে এ অঞ্চলের ১৩ হাজার ৭০০ একর এলাকা। এখানে গড়ে উঠবে ছোট-বড় শিল্পকারখানা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা। দৃষ্টিনন্দন পারকি সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে ১ হাজার ৭০০ একরজুড়ে হবে বিনোদনকেন্দ্র।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম চৌধুরী বলেন, টানেল হলে চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর, শহরের শিল্পকারখানার গাড়ি—সবই পার হবে। এতে শহরের ওপর চাপ কমে যাবে। ঢাকা থেকে আসা লোকজন নির্বিঘ্নে টানেল হয়ে কক্সবাজার যেতে পারবে। চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, চট্টগ্রাম শহরের এক দিকে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৮ হাজার মানুষ বসবাস করে, অন্য দিকে বাস করে ২ হাজার মানুষ। নদীর তল দিয়ে যোগাযোগ বাড়লে ভারসাম্য তৈরি হবে। মানুষের জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।

Advertisement